শিশুকে কতোক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত?

Boy using a screen
ছবির ক্যাপশান, আজকাল শিশুদের হাতে তাদের বাবা মায়েরাই স্ক্রিন তুলে দেন নিজেদের ঝামেলা এড়াতে।
Published

শিশুকে সামলানোর জন্যে তার হাতে কি প্রায়শই স্মার্ট ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ তুলে দেন? কিম্বা নিজে কোন একটা কাজে ব্যস্ত বলে টেলিভিশনে চালু করে দেন কোন কার্টুন?

শিশু সন্তানকে খাওয়ানোর কাজটা সহজ করতে অনেকে পিতামাতা এসব স্ক্রিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন। দেখা গেছে, বাচ্চাদের হাতে এসব তুলে দিলে তারা এগুলোতে বুদ হয়ে থাকে এবং তখন তাদেরকে খাওয়াতে খুব একটা ঝামেলা হয় না।

কিন্তু শিশুকে এসব স্ক্রিনের সামনে খুব বেশি সময় কাটাতে দিলে তার পরিণতি কী হতে পারে সেবিষয়ে কি আপনি সচেতন?

কানাডায় এসম্পর্কে চালানো বড় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলে শিশুদের দক্ষতার বিকাশে বিলম্ব ঘটতে পারে যার মধ্যে রয়েছে কথা বলতে শেখা এবং অন্যান্যদের সাথে মেলামেশা।

দুই বছর বয়সী প্রায় আড়াই হাজার শিশুর উপর নজর রাখার মাধ্যমে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

বাচ্চাদেরকে আসলে ঠিক কতোটুকু সময় স্ক্রিনের সামনে থাকতে দেওয়া নিরাপদ সেনিয়ে যখন কথাবার্তা চলছে তখনই এই গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হলো।

কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাচ্চার বয়স দেড় বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া ঠিক নয়।

এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।
ছবির ক্যাপশান, এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।

তবে কোন কোন বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, এজন্যে সুনির্দিষ্টভাবে কোন বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া খুব কঠিন।

এই গবেষণায় পাঁচ বছর ধরে মায়েদের ওপরেও জরিপ চালানো হয়েছে। বাচ্চাদের স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে কোন বয়সে তাদের আচরণ ও দক্ষতা কেমন ছিল।

এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।

দেখা গেছে, দুই বছর বয়সী বাচ্চারা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৭ ঘণ্টা করে স্ক্রিনের সামনে কাটায়। কিন্তু তাদের বয়স যখন তিনে পৌঁছায় তখন তাদের স্ক্রিন টাইমও বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা। আবার যখন পাঁচ বছর হয় তখন সেটা কমে হয় ১১ ঘণ্টা। সাধারণত শিশুরা এই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের বিকাশে যে দেরি হয় সেটা খুব সহজেই চোখে পড়ে। দেখা গেছে, ঠিক তখনই স্ক্রিন টাইম আরো বেড়ে গেছে।

কিন্তু এর জন্যে স্ক্রিনের সামনে কতোটুকু সময় কাটাচ্ছে বা তারা স্ক্রিনে কী দেখছে- এর কোনটা সরাসরি দায়ী সেটা পরিষ্কার নয়। এর সাথে হয়তো আরো অনেক কিছুর সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন শিশুটি কিভাবে বেড়ে উঠছে অথবা শিশুটি কিভাবে তার সময় কাটাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, বাচ্চারা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যে সময়টা পার করছে, এই সময়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক কিছু শিখতে পারতো।

তারা বলছেন, এই সময়ে আরেকজনের সাথে কথা বলা ও শোনার দক্ষতা তৈরি হতে পারে। দৌড়ানো, কোন কিছু বেয়ে উপরে ওঠার মতো শারীরিক দক্ষতাও সে অর্জন করতে পারতো।

তবে এও বলা হচ্ছে যে, দেরি হয়ে গেলেও বাচ্চারা হয়তো পরে এসব দক্ষতা অর্জন করে ফেলতে পারে।

infant using a screen
ছবির ক্যাপশান, ছোট্ট এই শিশুটিও স্ক্রিন ব্যবহার করছে।

আরো পড়তে পারেন:

গবেষক ড. শেরি মেডিগ্যান এবং তার সহকর্মীরা বলছেন, শিশুরা যাতে খুব বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে না কাটায় সেদিকে নজর রাখা ভালো। এই বিষয়টি যাতে বাচ্চাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ কিম্বা পারিবারিক সময়কে কমিয়ে দিতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরী।

তারা আরো বলছেন, এই গবেষণাটিতে হয়তো আরো কম বয়সী শিশুদের উপর নজর রাখার প্রয়োজন ছিল। কারণ দেখা গেছে, সাধারণ এক বছরের মাথায় শিশুরা বেশি সময় ধরে স্ক্রিন ব্যবহার করতে শুরু করে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কতোটুকু সময়কে খুব বেশি সময় বলে ধরা হবে?

এই প্রশ্নের আসলে সন্তোষজনক কোন উত্তর নেই।

নতুন এই গবেষণায় এরকম কোন সুপারিশও করা হয়নি যে শিশুকে কতো সময়ের বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়।

মায়েদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে দুই বছর বয়সী এসব শিশুর কেউ কেউ দিনে চার ঘণ্টারও বেশি এবং সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার মতো স্ক্রিন ব্যবহার করছে।

তবে এবিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ আছে:

যেসব শিশুর বয়স দেড় বছরের কম তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার না করতে দেওয়াই ভালো। তবে তাদের সাথে ভিডিও চ্যাট করা যায়।

দেড় থেকে দুই বছর বয়সী শিশুর যেসব পিতামাতা তাদের সন্তানকে ডিজিটাল মিডিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তাদের উচিত বাচ্চাদেরকে মানসম্মত অনুষ্ঠান দেখতে দেওয়া। এসময় বাবা মায়েরও উচিত তাদের সাথে বসে এসব দেখা এবং তারা কী দেখছে সেটা বুঝতে তাদেরকে সাহায্য করা।

দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরকে দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়। এবং যা দেখবে সেটাও যাতে মানসম্মত হয়। পিতামাতাকেও তাদের সাথে বসে এসব অনুষ্ঠান দেখতে হবে।

ছয় বছরের বেশি শিশুদের জন্যেও স্ক্রিন ব্যবহারের ব্যাপারে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। সেটা সবসময় একই রকম থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে স্ক্রিন যাতে ঘুমানোর কিম্বা খেলার সময় কেড়ে না নেয়।

তবে কানাডার শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের নিচে কোন শিশুকে স্ক্রিন দেখতে দেওয়া ঠিক নয়।

আরো পড়তে পারেন:

ভিডিওর ক্যাপশান, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: রাস্তায় শৃংখলা কতটা ফিরলো?