সংসদ নির্বাচন ২০১৮: বিএনপি অংশ নিচ্ছে, সেটাই কি ভারতের উদাসীনতার কারণ?

প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।। দিল্লিতে, ২০১৭
ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।। দিল্লিতে, ২০১৭
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
  • Published

বাংলাদেশে ২০১৪-র ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে যে দেশটি আগাগোড়া জোরালো সমর্থন জানিয়ে এসেছিল, সেটি ছিল ভারত।

ওই নির্বাচনকে সফল করার লক্ষ্যে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব নির্বাচনের ঠিক আগে ঢাকা সফর পর্যন্ত করেছিলেন।

কিন্তু পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পাঁচ বছর বাদে বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ভারত কিন্তু এবার অনেকটাই নিস্পৃহ - এই নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতের দিক থেকে তেমন কোনও সক্রিয়তাই চোখে পড়ছে না।

কিন্তু কেন ভারত এধরনের অবস্থান নিচ্ছে, বাংলাদেশে এবারের ভোটাকেই বা তারা কী চোখে দেখছে?

আসলে বাংলাদেশে ২০১৪র নির্বাচনের সময় ভারতের দিক থেকে যে ধরনের অতি-সক্রিয়তা ছিল, পাঁচ বছর বাদে এবারে তার কিন্তু ছিটেফোঁটাও নেই।

বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। ডিসেম্বর, ২০১৩
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। ডিসেম্বর, ২০১৩

আমাদের পেজে আরও পড়ুন:

এ বছরেই নির্বাচন হয়েছে নেপাল বা মালদ্বীপেও, সেখানেও ভারতের দৃশ্যমান কোনও ভূমিকা চোখে পড়েনি।

দিল্লিতে ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক মনে করছেন, খুব সচেতনভাবেই ভারত এবার বাংলাদেশের নির্বাচন থেকে একটা দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে।

ড: পট্টনায়কের কথায়, "২০১৪-তে ভারত যেভাবে পররাষ্ট্রসচিবকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল সেই অভিজ্ঞতা কিন্তু খুব সুখকর হয়নি। সেটাকে অনেকেই ভারতের হস্তক্ষপ হিসেবে দেখেছিলেন - যদিও ভারতের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে একটা সাংবিধানিক বিপর্যয় এড়ানো।"

"কিন্তু এখন বাংলাদেশের রাজনীতি যে ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাতে ভারতের উদাসীন থাকাটাই উচিত, আর তারাও ঠিক সেটাই করছে। ভুললে চলবে না, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও এর মাঝে অনেক পরিণত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।"

বাংলাদেশে বিগত নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নিতে রাজি হয়নি বলেই সেই নির্বাচনকে ঘিরে অত প্রশ্ন উঠেছিল।

২০১৪র সেই বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটের প্রচার
ছবির ক্যাপশান, ২০১৪র সেই বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটের প্রচার

কিন্তু এবারে নির্বাচন অনেকটাই অংশগ্রহণমূলক হতে যাচ্ছে - ফলে ভারতেরও অত মাথা ঘামানোর কোনও প্রয়োজন নেই, বিবিসিকে বলছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী।

তার কথায়, "বড় পরিবর্তন বাংলাদেশে যেটা দেখতে পাচ্ছি তা হল ভারতে যেটাকে আমরা 'মহাগঠবন্ধন' বলি, সেই ধাঁচে ওখানেও বিরোধীদের ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশ করেছে।"

"এখন তো আবার যুক্তফ্রন্টও চলে এসেছে। ফলে নির্বাচন সঠিক পথেই আছে মনে হচ্ছে - আর এভাবে যদি সব এগোয় তাহলে তো ২০১৪র তুলনায় সেটা সম্পূর্ণ আলাদা!"

"গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা তো এখন স্বাভাবিক পথেই আছে মনে হচ্ছে। সব দলও নির্বাচনে যোগ দিতে চাইছে, যেমনটা স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হয় আর কী। কাজেই মনে তো হয় না এই নির্বাচনকে সমালোচনা করার কোনও সুযোগ আছে বলে!"

বাংলাদেশে ভারতের আর এক প্রাক্তন হাই কমিশনার ভিনা সিক্রিও মনে করেন, "যদিও এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় - তারপরও বিএনপির নির্বাচনে যোগদান খুবই ইতিবাচক ব্যাপার।"

ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রি
ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রি

"তারা যেভাবে জোট শরিকদের সঙ্গে কথা বলছে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা করছে - যেমনটা স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে - সেটা অবশ্যই দারুণ বিষয়।"

"ভারত এখানে কী করল, বা কী করল না ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে তা খোঁজার কোনও দরকারই নেই", পরিষ্কার মত তার।

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনী পরিবেশে এখনও পর্যন্ত ভারত-বিরোধিতার কোনও আবহ তেমন নেই, দিল্লির দৃষ্টিতে সেটাও অত্যন্ত ইতিবাচক একটা পদক্ষেপ।

ফলে আগ বাড়িয়ে সে দেশের নির্বাচন নিয়ে অতি-সক্রিয়তা দেখিয়ে ওই পরিবেশ বিগড়ে দেওয়াও কোনও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এটাও হয়তো ভারত মাথায় রাখছে।

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর কথায়, "আমি তো বলব এটা পারস্পরিক সম্পর্কের একটা ম্যাচিওিরিটি, যেখানে অন্য দেশকে নিজের নির্বাচনে ডোমেস্টিক ইস্যু বানানোর কোনও দরকার পড়ে না।"

এবারের নির্বাচনের আগে ঢাকায় বিএনপির সদর দফতরের সামনের একটি দৃশ্য। ১৪ নভেম্বর, ২০১৮
ছবির ক্যাপশান, এবারের নির্বাচনের আগে ঢাকায় বিএনপির সদর দফতরের সামনের একটি দৃশ্য। ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

"হ্যাঁ, দুদেশের মধ্যেকার অভাব-অভিযোগ বা অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে অবশ্যই দুদেশের সরকারকেই ডিল করতে হবে। সেটা কিছুটা হয়নি, কিছুটা আবার হয়েছেও।"

"যেমন স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়েছে, সমুদ্র-সীমা চুক্তি হয়েছে। প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে, আধুনিকীকরণের কাজও হচ্ছে। তো এগুলো তো একটা সুফল দেবেই!", বলছিলেন তিনি।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এই পরিণতি আর ভোটে বিএনপি-র যোগদান, এই দুটো ফ্যাক্টরই আসলে পাঁচ বছর আগের তুলনায় ভারতের অবস্থানকে আজ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিবকে পাঠানো তো দূরস্থান, বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন নিয়ে তাই এখনও কোনও বিবৃতি দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি ভারত।