ইতিহাসের সাক্ষী

Published
idi amin

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, ইদি আমিন

১৯৭০এর দশকে আফ্রিকার রাষ্ট্র উগান্ডার স্বৈরশাসক ছিলেন ইদি আমিন। ১১৯৭৯ সালে এপ্রিল মাসে পতন ঘটেছিল এই ইদি আমিনের - যখন তানজানিয়ার সঙ্গে উগান্ডার লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তানজানিয়ার সৈন্যরা উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় প্রবেশ করে - এবং ক্ষমতাচ্যুত হন ইদি আমিন।

সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ইদ লুবেগা। তিনি তখন ছিলেন উগান্ডার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন ক্রীড়া সাংবাদিক। তিনি সেই সময়কার স্মৃতি বর্ণনা করেছেন বিবিসির এ্যালেক্স লাস্টের কাছে।

১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাস - তানজানিয়ার সৈন্যরা ঢুকে পড়েছে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায়। ছ মাস আগে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন উগান্ডার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনই ।

তিনি তার সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রতিবেশী তানজানিয়ের উত্তরাংশের একটি ভূখন্ড দখল করে নেবার জন্য।

এর আগেও দুটি দেশের সৈন্যদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত লড়াই হয়েছিল। কারণ অনেক দিন ধরেই তানজানিয়া ছিল ইদি আমিনের বিরোধীদের একটি ঘাঁটি। উগান্ডার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিল্টন ওবোটে - যাকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন ইদি আমিন - তিনি তানজানিয়াতেই থাকতেন।

তবে ইদি আমিন যখন তানজানিয়ায় আগ্রাসন চালালেন - তখন তানজানিয়ার নেতা জুলিয়াস নিরেরে, পাল্টা অভিযান চালানোর জন্য তার সেনাবাহিনী এবং মিলিশিয়াদের নির্দেশ দিলেন।

ইদি আমিন সামরিক সহায়তা পেয়েছিলেন তার মিত্র লিবিয়ার কাছ থেকে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকেই তানজানিয়ার বাহিনী তাদের হারানো ভূখন্ড পুনরুদ্ধার করে নেয় , এবং উগান্ডার বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা নিয়ে ইদি আমিনকে উৎখাত করতে উগান্ডার ভেতরে ঢুকে পড়ে।

ইদ লুবেগা তখন ছিলেন উগান্ডার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন ছোকরা ক্রীড়া সাংবাদিক। কয়েক বছর আগেই তিনি ইদি আমিনের সৈন্যদের হাতে প্রচন্ড পিটুনি খেয়েছিলেন।

তবে তানজানিয়ার সৈন্যদের অগ্রাভিযানের খবর পেয়ে যখন অন্যরা পালিয়ে গেলেন, তিনি কিন্তু তার কয়েকজন সহকর্মী সহ টেলিভিশন ভবনেই থেকে গেলেন - যাতে অনুষ্ঠান সম্প্রচার চালু রাখা যায়।

"কাম্পালায় তখন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। দিনের বেলাতেও শহর একেবারে ফাঁকা। হাসপাতালে ডাক্তার নেই, নার্সরাও সব পালিয়ে গেছে। সবকিছু একেবারেই চুপচাপ, থমথমে। ভয়াল একটা পরিবেশ। তানজানিয়ানরা শহরেও ওপর বোমা ফেলতে শুরু করলো। সেই বোমার এমন প্রচন্ড শব্দ যে তাতে বাড়িঘর কাঁপতে থাকতো। যে কারুরই তাতে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাবে।"

আপনি তখন কি করছিলেন?

"আমার অফিসে একটা কফি টেবল ছিল। আমি সেই টেবিলটার নিচে আশ্রয় নিতাম। টেবিলটাকে একটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম। এপ্রিল মাসে ১০ তারিখ নাগাদ তানজানিয়ার সৈন্যরা কাম্পালা শহরে ঢোকার মুখে চলে এলো। ইদি আমিন এবং তার সৈন্য-সামন্তরা পালিয়ে গেলেন।"

ইদি আমিন

ছবির উৎস, PA

ছবির ক্যাপশান, ইদি আমিন

ইদি আমিনকে আপনি শেষ কখন দেখেছিলেন?

"যখন তিনি টিভি স্টেশনে এসেছিলেন। আমি তখন সেখানেই ছিলাম, একজন প্রযোজক হিসেবে। তিনি আমাদের সাথে কথাবার্তা বললেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। বললেন, "আমি না থাকলে দেশে গোলমাল শুরু হবে, আমি দেশকে ভালোভাবেই নেতৃত্ব দিয়েছি" - এই ধরণের কথাবার্তা। তবে তার এসব কথায় আরো মন গলে নি। সে বিদায় নিক, এটাই লোকে চাইছিল।"

তখন তাকে কেমন দেখাচ্ছিল?

"তাকে উস্কো-খুস্কো দেখাচ্ছিল। তার পরণে সামরিক পোশাকই ছিল। সেই পোশাকও ছিল অগোছালো, তাতে লেগে ছিল ধূলোবালি । হয়তো তিনি কোন রণাঙ্গনে গিয়েছিলেন। তামি দেখতে পাচ্ছিলাম তার মুখে ঘামের রেখা । ইদি আমিন ছিলেন একজন বিশালদেহী লোক। কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছিল যেন তার ওজন কমে গেছে। যদি আপনি ইদি আমিনকে এর আগে দেখে থাকেন - তাহলে তখন তাকে দেখলে আপনার খারাপ লাগতো। যদিও সংবাদ মাধমের সামনে তিনি বেশ প্রফুল্ল থাকার চেষ্টাই করছিলেন, কিন্তু তা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য লাগছিল না। ব্যাপারটা ছিল দু:খজনক। সেটাই শেষবার আমি তাকে দেখেছিলাম।"

আমি উগান্ডা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছি। উগান্ডার সামরিক বাহিনী অবশ্যই কোন বিদ্রোহী বাহিনী কাছে তার অস্ত্র সমর্পণ করবে না।। দেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই আছে।

"রাতের বেলা চারদিকেই লড়াই হচ্ছিল, গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সকালবেলা দেখা গেল, কাম্পালার আন্তর্জাতিক হোটেলটির নিয়ন্ত্রণে যে সেনা ক্যাম্পটি ছিল - তা আর নেই। ইদি আমিনের সৈন্যদের আর দেখা যাচ্ছে না। বিকেল বেলা আমরা বেশ দূর থেকে দুটি তানজানিয়ান সেনাদলকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তারা ঢালু রাস্তা দিয়ে কাম্পালার দিকে এগিয়ে আসছে। যখন তারা শহরের মাইলখানেক দূরে একটি গোলচক্করে পৌছালো - তখন সেখানে একটা বন্দুকযুদ্ধ হলো। কারণ সেখানে মোতায়েন ছিল লিবিয়ান সৈন্যরা। আমরা দূর থেকেও আগুন আর গোলাগুলি দেখতে পাচ্ছিলাম। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি। একটু পরই আবার সব শান্ত হয়ে গেল। এর পর তানজানিয়ার সৈন্যরা পায়ে হেঁটে শহরে ঢুকলো, এবং লোকজন উল্লাস করতে শুরু করলো।"

শহরটির পূর্ণ নিয়ন্তণে তখন হাজার হাজার তানজানিয়ার সৈন্য। তাদের চার পাশে আরো হাজার হাজার উগান্ডান লোক উল্লাস করছে। তার পর মাঝরাতের দিকে শুরু হলো গোলমাল। কাঁচ ভাঙার শব্দ। এরাত হতেই তারা বেরিয়ে পড়েছে লুটেরাদের দল, দোকানপাট ভেঙে যা পাচ্ছে - তাই নিয়ে যাচ্ছে। দোকানগুলোর দরজা-জানালা ভেঙে ফেলেছে, লোকজন সেখান থেকে থালাবাটি, বাসনকোসন বা অন্যন্য জিনিসপত্র - যা পাচ্ছে নিয়ে যাচ্ছে। দোকানের হিসেবের খাতাগুলো রাস্তায় পড়ে আছে।

একদিনে যখন উল্লাস উদযাপন চলছে , তখন অনেকের জন্য সুযোগ হলো ইদি আমিন সরকারের নিষ্ঠুরতার নির্দশন দেখার - যার হাতে নিহত হয়েছিল লাখ লাখ লোক। রাস্তায় নেমে ইদ লুবেগা মুখোমুখি হলেন একজন তানজানিয়ান সৈন্যের । লুট করার মতো কিছু পাওয়া যায় কিনা - তার সন্ধানেই ছিল সে। সৈন্যটি ইদকে বললো - উগান্ডার কুখ্যাত স্টেট রিসার্চ ব্যুরোর সদর দফতরে যাবার পথটা চিনিয়ে দিতে । এটা ছিল ইদি আমিনের গোপন পুলিশের ঘাঁটি।

"সৈন্যটি বলছিল দেশে ফিরে গিয়ে সে একটা গাড়ি মেরামতের দোকান দেবে। তাই সে ভাবছিল - এ সুযোগে কিছু যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় কিনা, যা তার কাজে লাগবে। তার মনে হয়েছিল পুলিশের হেডকোয়ার্টারে গেলে সেখানে একটা গ্যারাজ পাওয়া যাবে, তাতে নানা রকম জিনিসপত্র পাওয়া যাবে - যার দিকে এখনো কারো চোখ পড়েনি।"

"ভবনটা খুবই সাধারণ দেখতে - আর দশটা ফ্ল্যাট বাড়ির মতোই । কিন্তু আমরা যখন বাড়িটার 'সেলার' বা মাটির নিচের কুঠুরিতে ঢুকলাম, তখনই আসল ব্যাপারটা চোখে পড়লো। চারদিকে রক্তের দাগ। আমরা শুনেছিলম যে ওখানে ঢুকলে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে মারা হতো। বীভৎস দুর্গন্ধ জায়গাটাতে। দেখলাম, লাশ পড়ে আছে অন্তত পাঁচ-ছটা। চারদিকে প্রস্রাবের গন্ধ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বুলেটের খোসা।"

"একটা জায়গা - বলতে পারেন অন্ধকূপের মতো । সেখানে দু-একজন লোক দেখলাম, তখনো বেঁচে আছে। তারা কথা বলছিল। কিন্তু কি বলছিল কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সম্ভবত তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা কোথা থেকে এসেছে, বাবা-মার নাম কি , আত্মীয়স্বজন আছে কিনা - তা-ও বলতে পারছিল না। তারা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছিল।"

"আমি বের হয়ে এলাম। সৈন্যটিকে বললাম - আমি চললাম, আমি আর এসব দেখতে চাই না।"

ইদি আমিন উৎখাত হবার পরেও উগান্ডায় সহিংসতা বন্ধ হয় নি। ক্ষমতার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে হানাহানি চলতেই থেকেছে আরো কয়েক বছর ধরে। চলেছে হত্যা, নির্যাতন - গৃহযুদ্ধ। ১৯৮৬ সালে ইয়াওরি মুসেভেনির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা উগান্ডার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ।

ইদি আমিন মারা যান ২০০৩ সালে, সউদি আরবে নির্বাসিত অবস্থায়।

ইদ লুবেগা পরবর্তী জীবনেও সাংবাদিক হিসেবেই কাজ করেছেন। এখন তিনি কর্মরত বিবিসি ওয়ার্লড সার্ভিসের সোয়াহিলি বিভাগে।