তেরো বছরের মায়ের কোলে সাত মাসের শিশু, ভাইরাল ঘটনার নেপথ্যে কী?

ছবির উৎস, Screen Grab
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মঙ্গলবার থেকে একটি ভিডিও বেশ সাড়া ফেলেছে। যাতে দেখা যাচ্ছে, ছোট্ট ফুটফুটে এক শিশুর কোলে আরেকটি শিশু।
যে মেয়েটির কোলে শিশুটিকে দেখা যাচ্ছে, তারই বর্তমান বয়স ১৩ বছরের কিছু বেশি। আর কোলের ওই শিশুটির বয়সই সাত মাস, যে কিনা তারই সন্তান।
অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছর বয়সী শিশুই আবার সাত মাস বয়সী ছেলে শিশুটির মা। আর শিশুটির জন্মদাতা মো. শাকিল মিয়ার বয়স ২২ বছর।
প্রশ্ন উঠেছে, ১৩ বছর বয়সী শিশুই আবার কিভাবে এক সন্তানের মা হয়, ঘটনাটি ঠিক কী ঘটেছে?
বাংলাদেশের আইনেই বা বিয়ের বয়স নিয়ে কী বলা হয়েছে অথবা নোটারি পাবলিক করে বিয়ে কী বাংলাদেশে বৈধ?
আইনজীবীরা জানান, বাংলাদেশের আইনানুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়েদের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। এর নিচে হলে সেই বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Getty Images
ঘটনাটি ঠিক কী ঘটেছে?
যে কিশোরীকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা, গত বছর ঘটনার সময় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল সে।
তার বাবা জুয়েল খান পেশায় ড্রাইভার এবং মেয়ের মা সৌদি আরবে চাকরি করতেন। ঘটনার সময় দেশে ছিলেন না। তবে পরে দেশে ফেরেন তার মা।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মেয়েটি টিকটকে ভিডিও তৈরি করতো এবং ২০২৫ সালে টিকটকেই মেয়েটির মো. শাকিল মিয়ার সাথে পরিচয় হয়।
মেয়েটির বাবা জুয়েল খান বলেন, "গতবছর প্রথমে একবার নিয়া সাতদিন রাখছে। আমি গিয়া থানায় জিডি করছি।"
সাতদিন পরে ওই মেয়েটি আবার বাড়িতে ফিরে আসে। তবে আবার ১৫ দিন পরে মেয়েটিকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে ১১-১২ দিনের জন্য নিয়ে যায় বলে জানান মি. খান।
"নোটারি পাবলিক করে তারা বিয়ে করাইছে, তার মারে। বললাম এইভাবে কি মানুষ বিয়ে করে? কয় আমি এইভাবেই বিয়ে করাই, ছোট ছেলেরেও এইভাবে বিয়ে করাইছে, কোনো কাবিন নাই" বলেন ওই মেয়ের বাবা মি. খান।
এই বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে জানান মি. খান।
"কোর্টও বলে এটা কাবিন না কাজীও বলে এটা কাবিন না। তাহলে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করছে? রেইপ করছে?" বেশ ক্ষোভের সাথেই বলেন তিনি।
মেয়েটির বর্তমান বয়স ১৩ বছর চার মাস ২৩ দিন। আর জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার বয়স ২২ বছর।
মেয়েটির বাবা মি. খান জানান, শাকিল মিয়া কেরানীগঞ্জের কোনো এক স্থানে নিয়ে যায় তার মেয়েকে।
পরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মেয়ে সাত মাস একদিন বয়সী শিশুটির জন্ম দেয় বলে জানান তিনি।
কিন্তু একপর্যায়ে মাস তিনেক আগে ওই শিশুটিকে রেখে দিয়ে অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার পরিবার মেয়েটিকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে গত ২০শে মে নিজের সাত মাসের সন্তানকে ফেরত চেয়ে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন ১৩ বছর বয়সী এই কিশোরী।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মোঃ সায়েম খানের নির্দেশে গত ১৬ই জুলাই ওই সাত মাসের শিশুকে নিয়ে তারা হাজিরা দেন।
পরে লিগ্যাল এই অফিসারের নির্দেশে সোমবার ঢাকার চকবাজার থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।
এই সপ্তাহের মঙ্গলবার লিগ্যাল এইড অফিসার শিশুটিকে তার কিশোরী মায়ের কাছে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
একইসঙ্গে, আগামী মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত রয়েছে।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বা জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সভাপতিত্বে উভয়পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।
এই মধ্যস্ততা কার্যক্রম মূলত সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে একটি আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনি পদক্ষেপ।
এই ঘটনাকে ধর্ষণ দাবি করে মেয়ের বাবা জুয়েল খান জানান, ওইদিন শাকিল মিয়ার কঠোর শাস্তি দাবি করবেন।
এদিকে, অভিযুক্ত মো. শাকিল মিয়া অবশ্য দাবি করেছেন, যখন বিয়ে হয় তখন মেয়েটির ২০ বছর বয়স ছিল।
"ওর বাবা বয়স কমাইছে। যখন জন্ম নিবন্ধনের কাগজ দিছে তখন দেখি ২০ বছর বয়স। কাবিনেও ২০ বছর ছিল। এখন কোর্টে গিয়া দেখি একটা কাগজে বয়স দিছে ১৩ বছর" বলেন মি. মিয়া।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করেন মি. মিয়া।
অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার বাড়ি ঢাকার চকবাজার এবং মেয়েটির বাড়ি হাজারিবাগ এলাকায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে মেয়েটির সাথে পরিচয় হয়।
একইসঙ্গে, মেয়েটিকে তুলে নেয়া হয়েছে বলে তার পরিবার যে অভিযোগ করেছে সেটি মিথ্যা বলেও দাবি করেন তিনি।
"আমার সাথে সে স্বেচ্ছায় গেছিল। পালায়া গেছিল। ও আমাকে বলছে, ওর বাপ-মা ওর জন্য বিয়া ঠিক করছে, আমি যদি না নিয়া যাই তাহলে মইরা যাইব। তারপরে আমি নিয়া গেছি বাধ্য হইয়া" বলেন শাকিল মিয়া।
তিনি জানান, পরে মেয়েটির বাবার কাছে ফোন দিয়ে জন্ম নিবন্ধন চান।
ওই নিবন্ধনেই মেয়েটির বয়স ২০ বছর লেখা ছিল বলে দাবি করেন অভিযুক্ত মি. মিয়া।
বিয়ের কাবিনেও মেয়েটির বয়স ২০ বছর লেখা বলে জানান শাকিল মিয়া।
তিন মাস আগে মেয়েটি তার বাবা অসুস্থ "স্ট্রোক করছে" বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় বলে দাবি করেন শাকিল মিয়া।
শিশুটিকে তার পরিবারের কাছেই রেখে যায় বলে জানান তিনি।
"এক ঘণ্টার জন্য যাইয়া তিন মাস ধরে কোনো খোঁজ-খবর নাই, পোলার কোনো খোঁজ-খবর নেয় না" দাবি করেন শাকিল মিয়া।
এরইমধ্যে, শিশুটির অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেছেন শাকিল মিয়া।
তবে, শিশুটি এইমুহূর্তে কিশোরী মায়ের কাছে থাকলেও পরে কার কাছে থাকবে সে বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শুনানি হবে।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
নোটারি পাবলিকের বিয়ে ও বয়স নিয়ে যেসব প্রশ্ন
এই বছরের পহেলা জানুয়ারি যখন কিশোরী মেয়েটির সন্তান হয়, সেসময় বয়স ছিল ১২ বছর চার মাস।
এই কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জানান, বাচ্চাটিকে রেখে তাড়িয়ে দিলেও তার মা সৌদি আরবে থাকায় বাবা তেমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি, আবার থানাও সহযোগিতা করেনি।
এরইমধ্যে, ওই শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে ছেলের মা মামলা করেছে বলে মেয়েটির পরিবার জানতে পারে।
পরে তার মা দেশে ফিরলে তারাও আইনী পদক্ষেপ নিতে লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে যায় বলে জানান আইনজীবী মি. মিত্র।
তিনি বলেন, "ম্যাজিস্ট্রেট মোটামুটি ওর বক্তব্য শুনে বাচ্চাটিকে উদ্ধার করিয়েছেন। তিনিও (ম্যাজিস্ট্রেট) অবাক হইছেন, আমিও একটা ট্রমার মধ্যে ছিলাম, কিভাবে সম্ভব, এই বাচ্চা আবার নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চা জন্ম দিছে!"
নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে শাকিল মিয়ার সাথে মেয়েটির বিয়ে প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে মি. মিত্র জানান, এই বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তিই নেই।
জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের শুনানিতে, ছেলেটির আইনজীবী তালাক হয়েছে দাবি করে শিশুটির গার্ডিয়ানশিপ চাইলে এই বিয়ের বৈধতা নিয়ে মি. মিত্র প্রশ্ন তোলেন বলে জানান।
"ছোট্ট মেয়ে সে, তালাকতো পরের বিষয়, আমি বললাম, বিয়েটা কিভাবে হলো? আইনে ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত তো বিয়েই হয় না। আর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিড করে বিয়ের তো আইনি ভিত্তি নেই, বিয়েটাতো কোনো আইনেই কাভার করে না" বলেন কিশোরী মেয়ের আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র।
দেশের আইনানুযায়ী, এই বিয়ের ভিত্তি নেই উল্লেখ করে মি. মিত্র জানান, এই কারণে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে নতুন শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করবেন।
উল্লেখ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর, একটি সংশোধনী এনে ২০২৬ সালে বিল পাস করা হয়।
এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সের কোন শিশুর সাথে তার সম্মতি বা সম্মতি ব্যতিরেকে যদি কোন ব্যক্তি যৌনকর্ম করেন, তাহলে তিনি ওই নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবে।
মি. মিত্র জানান, "১৬ বছরের নিচে যত ভিকটিম হবে তাদের বিচার হবে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে। ঢাকায় একমাত্র ট্রাইব্যুনালে এই মামলা করবো আমি।"
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আনা সংশোধনীর ফলে আপোসের কোনো সুযোগই নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, "১৮ বছরের নিচে যত ভিকটিম হবে তাদের কোনো জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়। এখন নতুন সংশোধনীতে প্রমাণসাপেক্ষে ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ফাঁসি দুইটাই আছে। এই আইনটা কঠিন করছে, কোনো আপোস নাই।"
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আইনানুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়েদের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের এক সহায়িকায় বাল্যবিবাহ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বয়সের শর্ত ছাড়াও বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের সম্মতি থাকার শর্তও রয়েছে আইনে।
এই সম্মতি জোরপূর্বক নয় স্বেচ্ছায় দিতে হবে। যদি জোরপূর্বক সম্মতি আদায় করা হয় তাহলে সেই বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে।
এছাড়াও বাংলাদেশের আইনানুযায়ী, বিয়ে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে বলে ওই সহায়িকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে, নির্ধারিত বয়সসীমার নিচে বা কম বয়সী ছেলে-মেয়ের বিয়ে হলে সেটি বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হবে এবং বৈধ হবে না। দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবর্ণা সীমা বলেন, "দেশের আইনে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিড করে বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নোটারি পাবলিকের বিয়ের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই এবং একে বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হয় না।"
নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করলে পরবর্তীতে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে কোনো আইনি অধিকার, যেমন: দেনমোহর, উত্তরাধিকার বা খোরপোষ দাবি করা যায় না বলে জানান তিনি।
এছাড়া, বয়স গোপন করে বাল্যবিবাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে নোটারি এফিডেভিট ব্যবহার করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, বাংলাদেশে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, কেবল নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে করা বিয়েই আইনত বৈধ।
একইসঙ্গে, অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও নিজ নিজ ধর্মীয় আইন ও নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ করেন তিনি। এক্ষেত্রে ম্যারেজ সার্টিফিকেটও সংগ্রহ করতে হবে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অবৈধ বিবাহ এবং তালাক কার্যক্রম বন্ধে বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিড করে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নির্দেশনাও জারি করেছিল।








