মানবাধিকার সুরক্ষা প্রশ্নে কথা রাখতে পারেনি বিএনপি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার সুরক্ষা প্রশ্নে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা সেটি রক্ষা করতে পারেনি বলে এক বিবৃতিতে বলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

বুধবার প্রকাশিত এই বিবৃতিতে সংস্থাটি বলছে, বরং সম্প্রতি এমন তিনটি আইন পাস করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আবারও পেছনে ঠেলে দিয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যে তিনটি আইন নিয়ে সংস্থাটি এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেগুলো হলো- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন- ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন- ২০২৬ এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে দেওয়া সংক্রান্ত 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন- ২০২৬'।

এইচআরডব্লিউ বলছে, এসব আইন করার সময় এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার সুরক্ষায় বেশকিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল যা নতুন তিন আইন পাসের পর বাতিল হয়ে গেছে। এতে অতীতে ব্যাপকভাবে ঘটে যাওয়া গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দু'টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল; সেখানে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাগ্রহণের পর তারেক রহমানের সরকার সেই কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করে এবং নতুন আইনে প্রতিষ্ঠানটির তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করা হয়েছে- বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের জন্য দায়ী পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী 'র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন' (র‍্যাব) বিলুপ্ত করার দাবি করা হলেও 'কার্যত কেবল সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

এমনকি সাধারণ পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে যে ধরনের সুরক্ষামূলক নিয়ম প্রযোজ্য হয়, সেগুলো নতুন আইনে রাখা হয়নি বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

"নিরাপত্তা বাহিনীকে তদন্ত ও জবাবদিহির বাইরে রাখার নতুন সরকারের যে প্রচেষ্টা, সেটি থেকে এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না যে, হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা অতীতের বিষয় হয়ে থাকবে," বিবৃতিতে বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলায়িন পিয়ারসন।

তিনি মনে করেন, অতীতে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে "প্রকৃত সংস্কার ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা প্রয়োজন"।

বন্ধ হয়নি নির্বিচারে আটক

বর্তমান সরকারের সময়েও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঢালাওভাবে আটক করার ঘটনা থামেনি বলে জানাচ্ছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, সমালোচকদের আটক এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগের মতো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

"যদিও হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কিন্তু (তারেক) রহমানের সরকার, তার পূর্বসুরির (আওয়ামী লীগের) মতোই, শত শত কথিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকে রেখেছে," বলছে এইচআরডব্লিউ।

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু সেটি স্বাধীন ছিল না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগ তারা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করতে পারতো না।

"তখন সরকার বা সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রভাবিত একটি কমিটি মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের নির্বাচন করতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে তারা কেবল 'সরকারের কাছে প্রতিবেদন তলব' এবং কিছু সুপারিশ তুলে ধরতে পারতো," বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দিয়েছিল। একইসঙ্গে, তহবিল সংগ্রহ এবং কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।

এর ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়, যা নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন অনুযায়ী আটক কেন্দ্র পরিদর্শন এবং পর্যবেক্ষণের জন্য আবশ্যক।

অধ্যাদেশটি বহাল রাখার জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত নতুন সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি সংসদে অনুমোদন পায়নি।

"বিএনপি প্রশাসন এটিকে বাতিল হতে দিয়েছে," বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাদেশের সংসদে বিরোধীদলের ওয়াকআউট সত্ত্বেও গত ছয়ই সেপ্টেম্বর সংসদে মানবাধিকার কমিশন নিয়ে নতুন একটি আইন পাস করা হয়েছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

এটি কেবল অভিযুক্ত সংস্থার কাছে একটি প্রতিবেদন চাইতে পারে। যদিও একটি অস্পষ্ট বিধান থেকে মনে হয় যে, সংস্থাটি রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ হলে বা তাদের প্রতিবেদন সন্তোষজনক বলে বিবেচিত না হলে, তখন এনএইচআরসি নিজস্ব তদন্ত শুরু করতে পারবে।

"নতুন আইনটির মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আবারও ফিরিয়ে আনা, কমিশনের বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা হ্রাস এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার মর্যাদা ও স্বাধীনতা অবনমিত করা হয়েছে," বিবৃতিতে বলেছে এইচআরডব্লিউ।

আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটির মতো বর্তমান সরকারের নতুন আইনেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য যে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অর্থাৎ 'প্যারিস নীতিমালা', সেটি মান্য করা হয়েছে বলে মনে হয় না।

সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ

গত ছয়ই সেপ্টেম্বর সংসদে 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন' পাস করা হয়েছে। সেখানেও বেশকিছু সংস্কারকে বাতিল করা হয়েছে, যেগুলো গৃহীত হয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

আগের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা আর নেই। এখন গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থার পরিবর্তে অন্য একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে সরকার।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, কোনো গোপন আটককেন্দ্র আছে বলে সন্দেহ হলে সেখানে নজরদারি, পরিদর্শন ও তদন্ত করার ক্ষমতা এনএইচআরসি'র থাকবে।

নতুন আইনে সেই ক্ষমতাগুলো "কেড়ে নেওয়া হয়েছে" বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

বলপূর্বক অর্ন্তধান বা গুমের ঘটনায় নির্দেশ বা কমান্ডের দায় নির্ধারণের আইনি মানদণ্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে নতুন আইনে।

আগে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ওপর ভিত্তি করে রাখা আইনি কাঠামোতে এমন কর্মকর্তাকে দায়ী করা যেত, যিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন বা যার জানা উচিত ছিল এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি।

"বলপূর্বক অন্তর্ধান বা গুমের ঘটনায় কোনো কমান্ডিং অফিসারকে দায়ী করতে এখন সরাসরি আদেশের প্রমাণ প্রয়োজন হবে," বিবৃতিতে বলেছে এইচআরডব্লিউ।

এসআরবি নিয়ে প্রশ্ন

গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত পুলিশের বিশেষ বাহিনী 'র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন' (র‍্যাব), যাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেই সংস্থাটি গত দশই সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপি সরকার।

কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে যে, বাহিনীটি আসলে বিলুপ্ত করা হয়নি, বরং নাম পরিবর্তন করা হয়েছে মাত্র।

নতুন আইন অনুযায়ী, বিলুপ্ত হওয়া র‍্যাবের জনবল, ক্ষমতা, নথিপত্রসহ যাবতীয় সম্পত্তি নতুন বাহিনী 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নে'র (এসআরবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

"এমনকি লোগোটিও একই থাকছে, শুধু 'আরএবি'র দু'টি অক্ষর বদলে 'এসআরবি' লেখা হয়েছে...অথচ বিএনপি নিজেও এর আগে র‍্যাব ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল," বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

বাহিনীর নাম পরিবর্তন করা হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিষেধাজ্ঞা 'পুনর্বিবেচনা' করতে পারে বলে আশা করছে বিএনপি সরকার। যদিও নতুন আইনে কার্যকর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বর্তমান সরকারের ওপর চাপ দেওয়া উচিত।

"যাতে নতুন আইনের অধীনে র‍্যাবের কার্যক্রমের জন্য এখনো খসড়া না হওয়া বিধিমালায় কর্মীদের কঠোর মানবাধিকার যাচাই, স্বাধীন বাহ্যিক তত্ত্বাবধান, গ্রেফতার ও আটক সংক্রান্ত সুরক্ষাব্যবস্থা, র‍্যাবের নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বেসামরিক আইন প্রয়োগের জন্য ডেপুটেশনে আসা সামরিক-কর্মীদের নিয়মিত মোতায়েন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়"।

"মানবাধিকারের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন এবং অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নতুন নামকরণ করা সংস্থাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা," বলছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও দেশটির নতুন সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নীতিমালা নিয়ে জোরালো উদ্বেগ প্রকাশ করা উচিত বলেও মনে করে মানবাধিকার সংস্থাটি।

"ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী একটি সরকারকে উৎখাত করতে বিক্ষোভকারীরা জীবন বাজি রাখার পর তারেক রহমান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন"।

"নতুন সরকার যে এত দ্রুত শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক পথ অনুসরণ করছে, সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি," বলেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলায়িন পিয়ারসন।