'আকাশের দিকে আর তাকাই না'- এক বছর পরও ক্ষত বইছেন এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্তরা

ছবির উৎস, Zoya Mateen
- Author, জোয়া মতীন
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা, আহমেদাবাদ
- Published
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটির কিছু বিবরণ পাঠকের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
ঘরটির দেওয়াল বেশ পুরোনো, রঙের প্রলেপ উঠে গেছে বেশ কিছু জায়গা থেকে। রোজ ঘুম থেকে উঠেই সেই উজ্বল সবুজ রঙের দেওয়ালে টাঙানো ছবির দিকেই প্রথম চোখ চলে যায় প্রহ্লোদ ঠাকুরের।
ওই দেওয়ালে দেবদেবীদের কয়েকটি ছবি রাখা। কয়েকটি পিতলের বাসন ও পুরোনো কিছু পারিবারিক ছবিও একটা তাকে রাখা।
তার মধ্যে একটি তার স্ত্রী সরলাবেনের। অন্য ছবিটি তার নাতনি আধ্যার। একটি সাদা জামা পরে মিষ্টি হাসি হাসছে সে।
গত বছর জুন মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার যে বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল, সেটি বিজে মেডিক্যাল কলেজের চত্বরে আছড়ে পড়েছিল।
আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে এই অঞ্চলটির দূরত্ব দুই কিলোমিটারেরও কম। ওই দুর্ঘটনায় ২৬০ জন মারা গিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে ২৪১ জন ছিলেন বিমানের মধ্যে থাকা যাত্রী ও ক্রুরা। তাদের মধ্যেই ছিলেন মি. ঠাকুরের স্ত্রী সরলাবেন ও নাতনি আধ্যা।

ছবির উৎস, Aditya Dayal
বছর ঘুরে গেলেও রয়ে গিয়েছে গভীর ক্ষত
ওই ঘটনার এক বছর পার হয়েছে। কিন্তু মনের ভেতর কষ্টগুলো যেন শিকড় গেঁথে দিয়েছে অনেকটাই গহীনে।
মি. ঠাকুর বলেন, "ওদের কথা বড্ড মনে পড়ে। ছবিগুলোর দিকে তকালেই যেন বুক ফেটে কান্না আসে।"
এদিকে তদন্তকারী দল শিগগিরই এই দুর্ঘটনার রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারে।
গত বছর থেকেই বেশিরভাগ সময়েই যাত্রী ও দুর্ঘটনার পেছনে কারণের উপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আহমেদাবাদের মানুষের মনে আরও একটি প্রশ্ন আছে। দুর্ঘটনার পরে দুর্ঘটনাস্থলের কী অবস্থা?
সাধারণত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্নগুলো মিলিয়ে যায়। কিন্তু বিজে মেডিক্যাল কলেজে সেই ক্ষত যেন স্থায়ী হয়েই রয়ে গিয়েছে।
বছর ঘুরে গেলেও ওই মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলটি যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, দেখলে মনে হয় যেন ক্ষত অংশে কেউ মলম লাগানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি।
উপরের তলার ছাদ ভেঙে এখনও আকাশের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে। এখনো কংক্রিটের ভাঙা অংশ এদিক ওদিক থেকে ঝুলে রয়েছে। সিঁড়িতে ধোঁয়ার কালো কালি এখনো এমনভাবে লেপে আছে যে অন্ধকারে সিড়িগুলোকে ঠাহরই করা যায় না।
দেওয়ালগুলোও কালো, আর বহু সুটকেস এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। চারদিকে ধুলো, ভাঙা পাথর ও বেঁকে যাওয়া লোহার সারি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Zoya Mateen
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
স্থানীয় কর্মকর্তারা এই ইমারতটি ভেঙে ফেলার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। এখানে নতুন হোস্টেল তৈরি হবে। ছাত্ররা এখন এই হোস্টেলের পাশ দিয়েই নিজের নিজের ক্লাসে যান।
উপর দিয়ে কয়েক মিনিট অন্তর অন্তরই বিমান উড়ে যায়। আগে এই শব্দ এই শহরের কাছে রাস্তায় গাড়ি-বাজারের শব্দের মতোই স্বাভাবিক অভ্যাসের অংশ ছিল।
কিন্তু এখন এই শব্দের অর্থ অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে।
প্রহ্লোদ ঠাকুরের ভাষায়, "প্রতিটা বিমানের শব্দেই কষ্টটা ফিরে আসে। আকাশের দিকে আর তাকাই না।"
প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পরিবার টিফিন পরিষেবা দিয়ে আসছিল। কাছেই অবস্থিত হাসপাতালে ডাক্তারদের খাবার পৌঁছে দিতেন ওরা। পুরো ক্যাম্পাসটিতেই প্রহ্লোদ ঠাকুর এই পরিষেবা দিতেন।
এই ক্যাম্পাসেই তার দুই বছরের নাতনি বেশিরভাগ সময় কাটাতো। ঠাকুমার কাছেই থাকতে ভালোবাসত মেয়েটি। যে সময়ে প্লেনটি ভেঙে পড়ে, তখন মেসে দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল।
সরলাবেন ওখানেই কাজ করছিলেন। তখন আধ্যা বাথরুমে যেতে চাইছিল। তাই ছোট্ট আধ্যাকে নিয়ে উপরের তলায় বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছিলেন সরলাবেন। কয়েক মুহূর্ত পরেই, ভবনটির উপর প্লেনটি এসে ধাক্কা মারে।
ওই সময়ে অন্য বিল্ডিংয়ে কাজ করছিলেন মি. ঠাকুর। সব ফেলে তিনি ধোঁয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেই দিনের কিছু টুকরো স্মৃতি এখনো তার মনে আছে। যেমন, একটা বড় বিস্ফোরণ, প্রচণ্ড গরম, রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ছড়িয়ে পড়ে থাকা, তার এক ঘর থেকে অন্য ঘর হন্যে হয়ে দৌড়ে বেড়ানো।
উনি তার স্ত্রীকে ডাকছিলেন, "সরলা! সরলা!" তখন কিছু মানুষ তার আশেপাশে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। আর কেউ কেউ ভেতরেই আটকে ছিলেন। উদ্ধারকারীদের দল ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে রাস্তা বানানোর কাজে ব্যস্ত ছিল।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সরলাবেনকে খোঁজার চেষ্টা করেছিল তাদের পরিবার। আহমেদাবাদের সব হাসপাতাল, সব ওয়ার্ড ও রিলিফ সেন্টারগুলিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিলেন তারা। মনের ভেতর আশার প্রদীপটা তখনও নিভে যায়নি।
ছয় দিন পরে, সরলাবেন ও আধ্যাকে তারা খুঁজে পান হাসপাতালের মর্গে।
আজ যখন প্রহ্লোদ ঠাকুর নাতনির স্মৃতিচারণ করেন, বার বার বিস্কুটের কথা মনে আসে। প্রায়ই নাতনির জন্য বিস্কুট কিনে নিয়ে আসতেন তিনি। আধ্যা যখন দৌড়ে তার কোলে উঠত, সেই মুহূর্তগুলোও বার বার মনে পড়ে তার।
বলেন, "আমাদের ক্যাম্পাসে মৃত্যু এসেছিল অকারণেই।"
সরলাবেনের স্মৃতি অবশ্য শুধু সরলাবেনকে ঘিরে নয়, সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার প্রায় গোটা জীবন। সরলাবেন তার সারা জীবন মানুষকে খাবার খাওয়াতেই উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
মি. ঠাকুর বললেন, "ও সবার সঙ্গে মিশতে পারত, খুব ভালো মনের মানুষ ছিল।"

ছবির উৎস, Zoya Mateen
"সেই ধোঁয়ার গন্ধ আজও নাকে লেগে আছে"
যখন মি. ঠাকুর ধোঁয়ার দিকে দৌড়াচ্ছিলেন, তখন মেসের ছাত্ররা ঘটনাটা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছিলেন।
দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য যেতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল আরমান খান পাঠানের। তার প্রিয় বন্ধু আদিত্য দয়াল আরও বেশি লেট হয়ে গিয়েছিলেন।
দুই বন্ধুর এই সামান্য দেরি, তাদের কাছে প্লেন ক্র্যাশের অভিজ্ঞতায় বড় এক ফারাক এনে দিয়েছিল। তবে দুজনের স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।
মি. পাঠান সদ্য খেতে বসেছিলেন। তখনই বিকট এক আওয়াজ করে ইমারতের একটা অংশ তার পাশেই ভেঙে পড়ে। একটি টেবিলও ভেঙে তার পায়ের উপর পড়েছিল।
এরই মাঝে গ্যাস সিলিন্ডারগুলোতে পর পর বিস্ফোরণ শুরু হয়। ধুলোয় ভরে যায় ঘরটি। নতুন করে বিস্ফোরণ শুরু হওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে পিছু হটতে হয়। ওই ঘরেই আটকে পড়েছিলেন আরমান খান পাঠান। নিঃশ্বাস আটকে আসছিল তার।
তিনি হাত দিয়েই একটি জানলা ভেঙে ফেলেন। আরমান বলেন, "চারদিকে ধোঁয়ার জেরে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল।"
যখন উদ্ধারকর্মীরা তাকে বের করে আনলেন, তখন তার বন্ধু মি. দয়াল ওখানে পৌঁছে গিয়েছেন। আদিত্য দয়ালের শুধু এটাই মনে ছিল যে, যে বিল্ডিং থেকে তিনি ধোঁয়া উঠতে দেখছেন সেখানে তার বন্ধু দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছে।
ছাত্ররা দিকভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ছুটছিলেন। ব্যাপারটা তখনও তারা ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছিলেন না।
অন্যান্যদের সাহায্য নিয়ে মি. দয়াল উদ্ধার করেন বন্ধু আরমান খান পাঠানকে।
তারপর তাকে একটি গদিতে শুইয়ে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নিয়ে যান। এক বছর পরেও দুই বন্ধু ওই দিনটার কথা তাদের হোস্টেলের ঘরে বসে মনে করেন।
ওইদিন মৃতদেহের মিছিল তাদের নাড়া দিয়েছিল। ডাক্তার হওয়ার কারণে তাদের সামনে কারও মৃত্যুর ঘটনা তাদের কাছে অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু এই ঘটনার জন্য তারা কেউই তৈরি ছিলেন না। কয়েকটি মরদেহ এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে সেগুলোকে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
মি. দয়াল বলেন, ওই গন্ধ বহুদিন ধরে তিনি অনুভব করেছেন। আজও মাঝে মধ্যেই ওই গন্ধটা তার স্মৃতিতে ফিরে আসে।
"বমি উঠে আসত আমার," বলেন তিনি।
তবে ওই দুর্ঘটনায় বহু বন্ধুকেই হারিয়েছেন তিনি। মি. পাঠান তার এক সহপাঠীর কথা উল্লেখ করলেন। তাদের পরিবারে অনেকগুলো বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন মি. পাঠানের সেই বন্ধু। ফলে, তাকে ঘিরে পরিবারের অনেক আশা ছিল।
অন্যান্যদের মতোই তিনিও নিজের ভবিষ্যতের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডেই সব শেষ হয়ে গেল।
এই কলেজেরই ছাত্র বৃজেশ তার দুই বন্ধুর সঙ্গে স্কুটারে চেপে মেসের দিকে যাচ্ছিলেন। তখনই বিমানটি ভেঙে পড়ে। তার পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানের চিকিৎসা এখনো চলছে।
আহমেদাবাদের তীব্র গরমেও তাকে প্রেশার ক্লথ পরতে হয়। এমনকি বইয়ের পাতা ওল্টাতেও তার কষ্ট হয়। তবুও তিনি বলেন, "যা ঘটে গেছে তা নিয়ে আর কীই বা করা যাবে।"
তিনি এখনো ওই ভগ্নস্তুপ হয়ে থাকা ভবনটির পাশ দিয়ে যান।
বহু ছাত্রের মতো মি. ব্রিজেশও ওই ভবনটির পাশ দিয়ে গেলেও সেদিকে না তাকানোর অভ্যাস তৈরি করে নিয়েছেন। উদ্দেশ্য, সেই বাড়িটির সঙ্গে জড়িত স্মৃতি যথাসম্ভব ভুলে থাকা।

ছবির উৎস, Zoya Mateen
'যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই আগুন'
তবে কলেজের আশেপাশে যারা থাকেন, তাদের এই অভ্যাস তৈরি করার জো নেই।
দুর্ঘটনার দিন দুপুরে নিজের বাড়িতে ছিলেন মি. বিজয়। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে থাকেন তিনি। ওইদিন তিনি জোরে এক বিকট শব্দ শুনেছিলেন।
তিনি তক্ষণাৎ বাইকে চেপে শব্দের উৎসের দিকে রওনা হয়েছিলেন।
যখন তিনি সেখানে পৌঁছান, তখন বিমানটি টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে এবং তাতে যে আগুন লেগেছিল তা দ্রুত বিল্ডিংগুলোর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছিল।
বেশ কয়েক ঘণ্টা সবাই টানা উদ্ধারকাজে হাত লাগালেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন। দমকল, সেনা ও উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে তারা সহযোগিতা করতে শুরু করলেন। জল নিয়ে আসা, মৃতদেহ ঢাকা দেওয়া ও আহতদের সাহায্যই তখন তাদের মুখ্য কাজ হয়ে উঠেছিল।
ওই দৃশ্য মি. বিজয়কে আজও বিচলিত করে তোলে। তিনি বলেন, "যেদিকেই তাকাই, শুধু আগুনই দেখতে পাই। কোথাও কারও মাথা পড়ে আছে, কোথাও হাত।"

ছবির উৎস, Aditya Dayal
একটি বছর পরে সেই কলেজ
দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর থেকে শহরবাসী ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স ও টিভি চ্যানেলের টিমগুলিও ওই ক্যাম্পাস থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেল।
যদিও ওই কদিনের দৌড়াদৌড়ির পরেও একটা অত্যন্ত কঠিন কাজ রয়েই গিয়েছিল - দুর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
বিজে মেডিক্যাল কলেজে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরী ছিল। এর দায়িত্ব গিয়ে পড়ে কলেজের ডিন মীনাক্ষী পারিখের উপরে। ওই কঠিন বেদনার আবহেও কলেজ সচল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
পেছনে ঘুরে তাকালে এক নয়, বরং টুকরো টুকরো বহু কষ্টের ছবিই তার চোখের সামনে ভেসে আসে। সেই সবই একই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। কোথাও মা বাবা তাদের বাচ্চাদের খুঁজছেন, কোথাও ছাত্রদের আহত অবস্থার বেদনাদায়ক ছবি।
তার স্টাফরা তখন ব্যস্ততার মাঝে দুই সেকেন্ডও দাড়ানোর সময় পাচ্ছিলেন না। অনেক পরিবারই তাদের প্রিয়জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
মীনাক্ষী পারিখ বললেন, "আমি একদিকে যেমন অত্যন্ত জরুরী কাজগুলোয় ব্যস্ত ছিলাম, তেমনই আরেকদিকে আমি নিজেই বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে আসলে হলো টা কী!"
স্বজন হারানো এক পরিবারের সঙ্গে তার যা কথা হয়েছিল, তা আজও তার মনে আছে। উনি জানালেন, এক ব্যক্তি তার ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনিকে হারিয়েছিলেন। তাদের মৃতদেহ না দেখে তিনি সেখান থেকে যেতেই চাইছিলেন না।
কর্মকর্তারা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ টেস্ট জরুরী। কিন্তু ওই ব্যক্তি উত্তরে বলছিলেন, "আমার চোখই ডিএনএ টেস্ট।"
তিনি বলছিলেন, তার পরিবারকে যে কোনও অবস্থাতেই তিনি ঠিক চিনতে পারবেন। এই স্মৃতিচারণা করে এক মুহূর্ত থামলেন মিজ. পারিখ।
তিনি ফের কথা বলতে শুরু করে জানান, "আমি বুঝতে পারছিলাম তার মনের ভিতরে কী চলছে।"
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলেজটিও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল। ক্লাস আবার শুরু হলো, পরীক্ষাও আবার শুরু হলো। বহু নতুন ছাত্ররাও পড়তে এলেন।
১২ই জুন এই দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে কলেজটি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে। প্রার্থনা সভা হবে, রক্তদান শিবিরও আয়োজিত হবে। মৃত ব্যক্তিদের স্বরণে বৃক্ষরোপন কর্মসূচীও নেওয়া হয়েছে।
কলেজটির ডিন মীনাক্ষী পারিখ মনে করেন, "জীবনে এগিয়ে যাওয়া ও ভুলে যাওয়া এক নয়। এক মুহূর্তের জন্যেও এটা মনে হয়না যে সেদিনের আকস্মিকতাকে আমি এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পেরেছি। জীবনের ছন্দে ফেরার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরেই হয়।"
প্রহ্লোদ ঠাকুরও এই চেষ্টাতেই আছেন। উনি প্রায়ই নিজের ফোনে একটি ভিডিও দেখেন।
সেই ভিডিওটা দুর্ঘটনার এক দিন আগের। ভিডিওতে আধ্যা তার ঠাকুমাকে ভালোবেসে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে ও সরলাবেন মৃদু হাসছেন। ঠিক তখনই বাইরের আকাশে আবার একটি বিমান চলে গেল। কিন্তু প্রহ্লোদ ঠাকুর আর বাইরে তাকালেন না।








