তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের গ্রেফতার করে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো, প্রশ্নের মুখে পুলিশ

    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসর বেশ কয়েকজন নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর কোমরে দড়ি বেঁধে 'প্যারেড' করিয়েছে। এরকম সর্বশেষ ঘটনাটি হয়েছে ফলতা বিধানসভা আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের সঙ্গে।

এদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলছে, ধৃতদের কোমরে দড়ি বেঁধে 'প্যারেড' করিয়ে ওই ব্যক্তির মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ফলতা আসনে নিযুক্ত পুলিশ পর্যবেক্ষকের সতর্কবার্তার জবাবে প্রকাশ্যে নিজেকে 'পুষ্পা' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন জাহাঙ্গির খান। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতারাতি খবরের শিরোনামে উঠে আসেন তিনি।

তবে বিতর্ক সেখানেই থেমে থাকেনি। ভোটের ঠিক আগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা থেকে শুরু করে চলতি মাসে ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিটাঙ্কি থেকে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়াসহ একের পর এক ঘটনায় বারবার আলোচনায় এবং বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাহাঙ্গির খানের নাম।

সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার পর, জাহাঙ্গির খানকে ফলতার রাস্তায় 'প্যারেড' করানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে সেই ভিডিও ভাইরালও হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, খালি পায়ে, হাত জোড় করে তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তার পরনে টি-শার্ট ও হাফ প্যান্ট। কোমরে বাঁধা রয়েছে দড়ি। তাকে ঘিরে রয়েছেন পুলিশকর্মীরা। কয়েকটি ভিডিওতে তাকে কান ধরে ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়।

'অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার নিয়মিত প্রক্রিয়া'

পুলিশ সূত্রের দাবি, মি. খানের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর) দায়ের রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক অভিযোগের তদন্ত এখনও চলছে।

পুলিশের বক্তব্য, একাধিক অভিযোগের তদন্তে ঘটনাস্থল পুনর্গঠন এবং তদন্ত-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে বিভিন্ন জায়গায় 'এস্কর্ট করে' নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে সংশ্লিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

রাজ্য পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, "একজন অভিযুক্তকে ঘটনাস্থল পুনর্গঠন করতে নিয়ে গেলে, তার স্থানীয় সমর্থকদের সাহায্যে তিনি পলাতক হতে পারেন। এই আশঙ্কা থাকে যখন কোনো অভিযুক্ত তার এলাকায় প্রভাবশালী হন এবং তদন্তের সময়ে ঘটনাস্থলে তার সমর্থকদের বড়ো ভিড় থাকার সম্ভাবনা থাকে।"

তিনি আরও বলেন, "অনেক সময় তদন্তকারী দলকে এমন এলাকায় অভিযুক্তকে নিয়ে যেতে হয়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে, তদন্তে বাধা সৃষ্টি হতে পারে বা অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার আশঙ্কাও থাকতে পারে। সেই কারণেই নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।"

অভিযোগ, মঙ্গলবার তৃতীয় বারের মতো কোমরে দড়ি বেঁধে মি. খানকে ফলতায় ঘোরানো হলে, তার মুক্তির দাবিতে তার কথিত সমর্থকরা থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।

এই ঘটনাকে ইঙ্গিত করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বুধবার ফলতার এক জনসভায় বলেন, "আইন হাতে তুলে নেবেন না। এই সরকার কাউকে ছাড়বে না। … ফলতায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এখানে শাসকের আইনের চলবে না। গুন্ডামি, জঙ্গিপনা, জমি লুট আমরা কোনোটাই ভবিষ্যতে করতে দেব না।"

"যত বড়ো মাফিয়া আর ডন হোক না কেন, তাকে সবক শেখানোর কাজ ভারতীয় জনতা পার্টি পরিচালিত রাজ্য সরকার করবে।"

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের এবং অতীতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে।

এখনো পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা, তবে কয়েকজন বড়ো নেতাও গ্রেফতার হয়েছেন।

'দড়ি পরিয়ে ঘোরানো মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন'

গত মাসে, একটি নাগরিক অধিকার সংগঠন হাওড়া জেলার কয়েকটি থানায় অভিযুক্তদের খালি পায়ে ও অন্তর্বাস পরিয়ে ঘোরানোর অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয় এবং তদন্তের দাবি জানায়।

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে ২৪শে মে গোলাবাড়ি থানা এবং ২৫শে মে সাঁকরাইল থানার দুটি ঘটনার উল্লেখ করেছে, যেখানে দুই অভিযুক্তকে অন্তর্বাস পরিয়ে ঘোরানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ২৪শে মে অভিযুক্ত আকাশ সিংহকে অন্তর্বাস ও গেঞ্জি পরিয়ে ঘোরানোর পর হেফাজতে নেওয়া হয়। পরদিন ২৫শে মে শামিম আহমেদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আচরণ করা হয়। কোমরে দড়ি বেঁধে তাকে রাস্তায় হাঁটানো হয়, এবং অন্তর্বাস ও গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় ঘোরানোর পর হেফাজতে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

এপিডিআরের চিঠিতে বলা হয়েছে, "ভারত সহ সারা পৃথিবীর মানবাধিকার আইনের গোড়ার কথা হলো, যতক্ষণ না দোষী প্রমাণিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত বন্দি নির্দোষ। দোষী বা নির্দোষ, সর্ব সমক্ষে কোনো বন্দিরই মর্যাদা হানিকর কোনো আচরণ রাষ্ট্র করতে পারে না।"

"সুপ্রিম কোর্ট বন্দিদের কোমরে দড়ি বাঁধার ক্ষেত্রে বারবার নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। বলেছে এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মর্যাদা হানিকর আচরণ। তাও হাওড়া পুলিশ একই আচরণ করেছে।"

বিবিসিকে এপিডিআরের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর বলেন, কোনও অভিযুক্ত দোষী কি না, তা বিচার করা এবং সেই অনুযায়ী সাজা দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু আদালতে দোষী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিযুক্ত নির্দোষ বলেই গণ্য হন।

"তদন্তের স্বার্থে কোনও সন্দেহভাজনের চলাফেরা বা স্বাধীনতার উপর কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে তদন্ত চলাকালীন একজন অভিযুক্তের নিরাপত্তা, মর্যাদারক্ষা এবং তার অধিকার সুরক্ষিত রাখা দায়িত্ব রাষ্ট্রের।"

তিনি আরো বলেন, "ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের নামে কারও কোমরে দড়ি বেঁধে সবার সামনে তাকে প্যারেড করা এক ধরনের 'পাবলিক হিউমিলিয়েশন'। এটি কাস্টোডিয়াল টর্চারের (হেফাজতে বন্দি নির্যাতনের) একটি রূপ। কোনও অভিযুক্ত সন্ত্রাসবাদী না হলে বা সহিংসতা করার আশঙ্কা না থাকলে পুলিশি হেফাজতে এমন আচরণের কোনও যৌক্তিকতা নেই। দড়ি পরিয়ে কাউকে ঘোরানো মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।"

তিনি সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সমাজকর্মী ফরিদুল ইসলামের উদাহরণও দেন। মে মাসে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে বুলডোজার ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পর তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল।

মি. শূরের বক্তব্য, "এখনো পর্যন্ত, ফরিদুল কোনও দণ্ডিত অপরাধী নন, বরং শহরের অন্যতম পরিচিত সমাজকর্মী। অথচ ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের নামে গভীর রাতে তাকে তার কোমরে দড়ি বেঁধে নিজের পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাকে তার প্রতিবেশীদের সমানে সেই অবস্থায় এদিক ওদিক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের মনে হয়, পুলিশের এই প্রকাশ্য অপমান করার মধ্যে সাম্প্রদায়িক দিকও থাকতে পারে। কারণ এভাবে যাদের ঘোরানো হয়েছে, তাদের অনেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের।"

তিনি বলেন, এপিডিয়ারের চিঠির পর রাজ্য মানবাধিকার কমিশন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

"তদন্ত বিভাগের সুপারিন্ডেন্ট অব পুলিশকে ২০শে জুনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলেছে কমিশন। ১২ই জুন এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাওড়া জেলার পুলিশ সুপার ও বিভিন্ন থানাকে তদন্তে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। নোটিশ দেওয়া হয়েছে অভিযোগকারিকেও। কমিশনের তদন্ত বিভাগের তদন্ত রিপোর্ট পেলে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন ২৩ জুন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার করবে।"

আদালত কী বলছে?

চলতি মাসের পাঁচ তারিখ কলকাতা হাইকোর্টে এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলার শুনানিতে বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র অবকাশকালীন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দেয়। আদালত জানায়, কাউকে গ্রেফতার করা এবং তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী মামলা চালানোর অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে, কিন্তু তাকে অপমান বা হেনস্তা করার অধিকার নেই।

শুনানির সময় আদালত আরও বলে, গ্রেফতারের নামে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও অভিযুক্তকে জনসমক্ষে অপদস্থ করতে পারে না।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তিও পেতে পারেন। কিন্তু, বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনও অভিযুক্তকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা বা তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা গ্রহণযোগ্য নয়।

আদালত প্রশ্ন তোলে, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কী প্রয়োজনে পুলিশ এই ধরনের পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে? সেই কারণেই এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি জুলাই মাসে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।