ইরান যুদ্ধ অবসানে চীন কীভাবে সাহায্য করতে পারে ও বিনিময়ে কী চাইতে পারে?

ছবির উৎস, BBC / Getty Images
- Author, সাঈদ জাফারি
- Role, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- Author, গ্রেইস সোই
- Role, ডব্লিউএসএল গ্লোবাল জার্নালিজম
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
যুক্তরাষ্ট্রে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সফরের কয়েক দিন আগেই বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে স্বাগত জানানো হয়েছে, যা তেহরানের ওপর চীনের প্রভাবের একটি প্রমাণ।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প-শি বৈঠকের আলোচ্যসূচির শীর্ষ বিষয়গুলোর একটি হওয়ার কথা রয়েছে ইরান যুদ্ধ।
সাত মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন একটি ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেছে। তারা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করেছে, পাশাপাশি তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করেছে।
একই সময়ে, তারা বারবার যুদ্ধের অবসান এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশাল তেলের মজুত এবং জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণের কৌশলের কারণে এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভালোভাবেই সামলেছে চীন।
ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের চীন-মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়া ঘিসেলি বলেন, চীন আরও দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে, তবে অর্থনৈতিক ব্যয় কেবল বাড়তেই থাকবে।
তবে তিনি বলেন, যুদ্ধের অবসান দেখতে চাওয়ার স্বার্থের সঙ্গে অন্যান্য ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভারসাম্যও চীনকে রক্ষা করতে হবে।
ড. ঘিসেলি যোগ করেন, "চীন চায় না এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠুক," তবে তারা "ইরানের মৌলিক স্বার্থ ও দাবিকে ক্ষুণ্ন করবে না।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "ইরান ও চীন সাধারণভাবে একই অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের মতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডই এই সংঘাতের সূচনা ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণ।"
জ্বালানি ও অর্থনীতি
জ্বালানি ভোক্তা হিসেবে যুদ্ধের অব্যাহত অবস্থার কারণে চীন "ক্ষতিগ্রস্ত" হচ্ছে- বলছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের হামিদরেজা আজিজি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের মতে, তেল চীনের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হলেও এর ৭০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করা হয়।
প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল হিসেবে, গত বছর চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির মাত্র ১২ শতাংশ ছিল ইরানি তেল।
এটি মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের তুলনায় অনেক কম, যেখান থেকে এসেছে ৪২ শতাংশ।
রাশিয়া, ব্রাজিল এবং অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের সরবরাহ দিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য উৎপাদনকারীর কাছ থেকে হারানো তেলের একটি অংশ প্রতিস্থাপন করতে পেরেছে চীন।
তবে অঞ্চলটি থেকে যে গ্যাস তারা কিনে থাকে, সেটির বিকল্প খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হবে।

ছবির উৎস, Reuters
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
চীনের বিশাল তেলের মজুত যুদ্ধজনিত জ্বালানি ধাক্কা সামাল দিতে দেশটিকে সহায়তা করেছে।
তাদের মজুতের প্রকৃত পরিমাণ রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য বিবেচিত হলেও, ২০২৫ সালে এর পরিমাণ ১০০ কোটি থেকে ১৪০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক জ্বালানি গবেষক এরিকা ডাউনস বলেন, "যদি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রেখে থাকে চীন, তাহলে ২০২৫ সালের আমদানির হার অনুযায়ী এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ২৫৪ দিনের আমদানির চাহিদা পূরণ করতে পারত।"
তিনি আরও বলেন, চীনের তেলের মজুত সম্ভবত আরও দীর্ঘ সময় স্থায়ী হবে, কারণ যুদ্ধের মাঝেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু আমদানি অব্যাহত ছিল।
তবে রয়টার্সের এশিয়া কমোডিটিজ কলামিস্ট ক্লাইড রাসেলের মতে, গত চার মাসের মধ্যে তিন মাসেই, যার মধ্যে অগাস্টও রয়েছে, চীনকে তাদের তেলের মজুত ব্যবহার করতে হয়েছে।
ড. ডাউনস বলেন, "বেইজিং সম্ভবত যত দ্রুত সম্ভব তাদের মজুতে হাত দেওয়া বন্ধ করতে চাইবে, যাতে একটি পর্যাপ্ত সুরক্ষা বাফার বজায় থাকে।"
আর যদি ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের ওপর হামলা বাড়ায় এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থা একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও ডেকে আনতে পারে, যা রপ্তানিনির্ভর চীনা অর্থনীতির জন্য খারাপ খবর হবে।
২০১৯ সাল থেকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি দেশটি আবাসন খাতে সংকট, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় সরকারের ঋণ বৃদ্ধির সমস্যার মুখোমুখি।
ফলে, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৩২.৭ শতাংশ এসেছে নিট রপ্তানি থেকে, যা ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
দেশীয় ভোগব্যয় দুর্বল থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রপ্তানি।
নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আলোচনা
যুদ্ধ যখন অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে চলেছে।
ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে যে, ইরানের অর্থনীতিকে সহায়তা করা কোম্পানি, ব্যাংক ও দেশগুলো গৌণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি চীনা কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও, চীনের বড় ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত থেকেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ সতর্কতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এখনো তীব্র।
বেইজিং প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের অনুরোধে ইরানের বিরুদ্ধে আর্থিক অভিযানে যোগ দেয়নি। তাদের যুক্তি, তারা "অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার" বিরোধী এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Handout/Houthi Military Media Centre via EPA
ইরান বিষয়ক বিশ্লেষক আজিজি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে চীন সম্ভবত ইরানি তেল কেনা থেকে সরে আসবে না।
"চীনারা চায় না এমন কোনো নজির প্রতিষ্ঠিত হোক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চীনা কোম্পানি ও ব্যাংকগুলোকে নিজেদের নীতি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে।"
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ চীনা ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে।
মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, কিন্তু অগাস্টে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রতিদিন দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলের মধ্যে।
এছাড়া ১৪ই জুলাই যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নৌ অবরোধ শুরু করার পর থেকে কোনো ইরানি অপরিশোধিত তেলের চালান হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সফলভাবে চীনে পৌঁছাতে পারেনি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ গায়েদি বলেন, অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ক্রমশ স্থলপথভিত্তিক হয়ে পড়বে, যা ব্যয়বহুল এবং সামুদ্রিক পরিবহনের তুলনায় রপ্তানি সামলানোর সক্ষমতাও অনেক কম।
আর্থিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর চীনের আগ্রহ থাকলেই যে তাদের কাছে নৌ অবরোধ মোকাবিলা করার সক্ষমতা বা ইচ্ছা রয়েছে, তা নয়।
এ ধরনের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা বেইজিংকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
চীনের নেতৃত্ব এমন মূল্য দিতে প্রস্তুত, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।
ড. ঘিসেলি বলেন, চীন যুদ্ধের "আলোচনার মাধ্যমে সমাপ্তি" কামনার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে এবং সম্ভবত তারা ইরানকে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তোলা থেকে বিরত রাখবে।
"তারা আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সহায়তা করতে পারে এবং হয়তো করবে। এমনকি তারা ইরানিদের কিছু ছাড় দিতেও রাজি করাতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কোনো ধরনের বিজয় দাবি করার সুযোগ দেবে এবং সেটিকে যুদ্ধ শেষ করার অজুহাত হিসেবে তিনি ব্যবহার করতে পারবেন।"
তবে তিনি বলেন, চীন চাইবে যে কোনো চুক্তিতে তাদের অংশীদারের জন্য বাস্তব সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকুক, যেমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত অর্থে প্রবেশাধিকার এবং সামরিক হামলার অবসান।









