জাতিসংঘে জাইমা রহমানের নিয়োগ: লিগ্যাল অফিসার পদটির কাজ কী?

একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন জাইমা রহমান
ছবির ক্যাপশান, জাইমা রহমান সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হবেন কি না- এ নিয়েও বাংলাদেশে আলোচনা রয়েছে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এই পদে কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে তিনি কী কাজ করবেন- এমন নানা বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেককে প্রশ্ন তুলতে বা আলোচনা করতে দেখা গেছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে এখন দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, জাইমা রহমান লিগ্যাল অফিসার বা আইন কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে কাজ করবেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকায় জাইমা রহমানের নাম ও পদবিও উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে কর্মরতদের তালিকায় ৪০ জনের মধ্যে জাইমা রহমান ছাড়াও আরও পাঁচজন বাংলাদেশি রয়েছেন।

একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন জাইমা রহমান
ছবির ক্যাপশান, গত ডিসেম্বরে তারেক রহমান সপরিবারে দেশে ফেরার পর তার মেয়ে জাইমা রহমানকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা গেছে

লিগ্যাল অফিসারের কাজ কী?

জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য দেশের গোপন ভোটাভুটিতে ৯৯ ভোট পেয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

গত নয়ই সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই পদে দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন তিনি।

এর আগে, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের টিমে জাইমা রহমান আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন।

সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই পদে থাকা ব্যক্তি জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের কর্মকর্তা নন, তিনি মূলত সরাসরি সাধারণ পরিষদের সভাপতির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবেই কাজ করবেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, রেজুলেশন কীভাবে উত্থাপন হবে, কোনো দেশ পয়েন্ট অব অর্ডার তুললে সভাপতি কী রুলিং দেবেন, একটি প্রস্তাবের সংশোধনী গ্রহণযোগ্য কি না- এসব বিষয়ে সভাপতিকে আইনি পরামর্শ দেন লিগ্যাল অফিসার।

সাধারণ পরিষদে অনেক সময় স্পর্শকাতর বিষয়- যেমন ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ইস্যু- নিয়ে আলোচনা হয়। তখন সভাপতি যেন নিরপেক্ষ থাকতে পারেন এবং তার সিদ্ধান্তকে যেন কেউ 'পক্ষপাতদুষ্ট' বলতে না পারে, সেজন্য জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ও অতীতের নজির তুলে ধরে আইনি সুরক্ষা দেন লিগ্যাল অফিসার।

সাধারণ পরিষদে ওঠা কোনো রেজুলেশন বা প্রস্তাব আগের নিয়ম বা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাবে অন্য কমিটির অনুমোদন লাগবে কি না, লিগ্যাল অফিসার এসব বিষয়ও যাচাই করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, সভাপতি হিসেবে যেসব কাজ খলিলুর রহমান করবেন তার আইনি দিকগুলোই লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দেখভাল করতে হবে জাইমা রহমানকে।

এছাড়া এই পদে বেশ কিছু দাপ্তরিক কাজও রয়েছে।

জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগসহ অন্যান্য আইনি সংস্থার সাথে সভাপতির কার্যালয়ের সমন্বয় করা এবং সভাপতিকে যদি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইনি বিষয়ে বক্তব্য দিতে হয়, তার খসড়া তৈরিতেও সহায়তা করবেন তিনি।

সব মিলিয়ে সাধারণ পরিষদে সভাপতির কার্যক্রম যেন জাতিসংঘের আইন ও রীতির ভেতরেই থাকে, সে বিষয়ে আইনি দিকগুলো দেখভালের দায়িত্ব থাকবে লিগ্যাল অফিসারের ওপর।

জাতিসংঘ মহাসচিব এর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দেখা যাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান

নিয়োগ হয় যেভাবে

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই কার্যালয়ে মোট ৪০ জনের একটি টিম কাজ করছে।

যেখানে বাংলাদেশের ছয়জনসহ ২৯টি দেশের ছয়টি ভাষাভাষি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত সভাপতির কার্যালয়ে যে কাজগুলো রয়েছে তারই তদারকি করে থাকেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব পাওয়া অন্য বাংলাদেশিরা হলেন- কূটনীতিক মো. আব্দুল আলিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, মফিজুল ইসলাম, জাকির আহমেদ এবং মো. রফিকুল আলম মোল্লা।

এই তালিকায় এখন লিগ্যাল অফিসার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন জাইমা রহমান।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে জাতিসংঘে কর্মরত স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি নিজের এখতিয়ার থেকে কয়েকজনকে নিয়োগ করতে পারেন সভাপতি।

"এই পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এটি মূলত সভাপতি হিসেবে যিনি দায়িত্বে থাকবেন তার এখতিয়ার। জাতিসংঘে স্থায়ীভাবে কাজ করেন যারা তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ যেমন সভাপতির সঙ্গে যুক্ত হবেন, তেমনি সভাপতি নিজের চাহিদা অনুযায়ীও কিছু ব্যক্তিকে তার কার্যালয়ে নিয়োগ করতে পারেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

যদিও এক্ষেত্রে শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতা কি হবে সেই বিষয়ে একটা মানদণ্ড থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ, বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা জাতিসংঘে কাজ করা আইনজীবীদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ফলে এই পদে জাইমা রহমানের নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সব মানদণ্ড পূরণ হয় কি না এই বিষয়টি নিয়েও নানা আলোচনা সামনে আসছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দায়িত্ব পালন করছেন খলিলুর রহমান
ছবির ক্যাপশান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দায়িত্ব পালন করছেন খলিলুর রহমান

সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে, জাইমা রহমানকে একজন ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

মিজ রহমান কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন বলেও ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে 'দি অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল' থেকে সনদ পেয়েছেন মিজ রহমান, যা দেশটিতে ব্যারিস্টারি করার যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে একজন তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হিসেবেও জাইমা রহমান কাজ করছেন বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবাসন, জনকল্যাণ ও শ্রম আইন বিষয়ে যুক্তরাজ্যে কাজ করা এবং স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষা আইনের ওপর 'প্রো বোনো' (বিনামূল্যে আইনি সেবা) কাজ করেছেন মিজ রহমান- যা তার অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, বিচার পাওয়ার অধিকার এবং শিক্ষা ও লিঙ্গসমতা নিয়েও জাইমা রহমানের কাজের আগ্রহ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, এই পদে কাজ করার জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ না হলেও যে যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন সেটি জাইমা রহমানের রয়েছে।

ফলে এটি তার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি সুযোগ বলেই মনে করেন সাবেক এই কূটনীতিক।

"তিনি (সভাপতি) যেসব কাজ করবেন তার আইনি দিকগুলোতে সহায়তা করাই লিগ্যাল অফিসারের কাজ। সেখানে তিনি (জাইমা রহমান) একাই যে কাজ করবেন বিষয়টি তাও নয়। একটা টিমও তার সঙ্গে থাকতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।