ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও বিরোধীজোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু'র নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী দলগুলোর জোটের সঙ্গে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে।

তবে বুথফেরত জরিপে এখন পর্যন্ত যে ফলাফলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কোনো দলই সরকার গঠন করার মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলের দু'টি প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত সবশেষ বুথফেরত জরিপের ফলাফল বলছে, দু'টি জোটই ৫১টি করে আসন পেতে যাচ্ছে। যদিও তৃতীয় আরেকটি গণমাধ্যমের তথ্যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু'র জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে বলে আভাস দিচ্ছে।

কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দেশটির পার্লামেন্ট 'নেসেটে' কমপক্ষে ৬১টি আসন পেতে হবে, যা কোনো জোটই নিশ্চিত করতে পারছে না।

ফলে কীভাবে সরকার গঠিত হবে এবং শেষপর্যন্ত কারা ক্ষমতা গ্রহণ করবে, সেটি নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা হতে দেখা যাচ্ছে।

নেতানিয়াহু'র বিশ্বাস এবারও তারা বিজয়ী হবেন। সরকারিভাবে প্রকাশিত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, ভোটে জিতলে একটি 'শক্তিশালী ডানপন্থী' জাতীয় সরকার গঠন করবেন।

'আরব দলগুলোর সমর্থন' নিয়ে সরকার গঠন করা কোনো দল ইসরায়েলকে পরিচালনা করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছেন লিকুদ পার্টির এই নেতা।

অন্যদিকে, মধ্যপন্থী জোটের নেতা আইজেনকোট সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ইসরায়েল এবার নেতানিয়াহুর মেয়াদ শেষ করার পক্ষে রায় দিয়েছে।

"আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি," উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে করে সমর্থকদের বলেন আইজেনকোট।

কোন দল কতটুকু এগিয়ে?

ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম 'কান ১১' ও 'চ্যানেল ১৩' বুথফেরত জরিপের যে ফলাফল প্রকাশ করেছে, তাতে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও আইজেনকোটের মধ্যপন্থী দলগুলোর জোট- উভয়ই ৫১টি করে আসন পেতে যাচ্ছে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে।

বুথফেরত জরিপের এসব ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নেতানিয়াহু'র লিকুদ পার্টিই 'নেসেটে' একক দল হিসেবে সর্বাধিক আসন পেতে যাচ্ছে।

দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় ২৯টি আসনে জয়ী হওয়ার পথে রয়েছে। এই ফলাফলে দলটি উচ্ছাস প্রকাশ করেছে, কারণ প্রাথমিক জরিপের পর তাদের ধারণা ছিল যে, এবার বড়জোর ২৭টি আসন পেতে যাচ্ছেন।

কিন্তু বাস্তবে দলটি আরও বেশি আসনে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, আইজেনকোটের 'ইয়াশার পার্টি' এগিয়ে রয়েছে ২০টির মতো আসনে।

এর বাইরে, নেতানিয়াহু'র মিত্রদল উগ্র ডানপন্থী 'ওতজমা ইয়েহুদিত' সাতটি ও রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট আসন পেতে যাচ্ছে।

তবে রক্ষণশীল এসব দলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো। তারা ১৭টির মতো আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা তাদের এখন পর্যন্ত 'সেরা ফলাফল' বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে সরকারিভাবে ফল গণনা এখনও চলছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর চারটা নাগাদ প্রায় ২৫% ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এছাড়া প্রায় ছয় লাখের মতো ভোটার, যারা মূলত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত, তারা ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। সেটি মোট ভোটের প্রায় ১০ শতাংশ, যা বৃহস্পতিবারের আগে পুরোপুরি গণনা করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।

সবমিলিয়ে ভোট গণনা শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করতে আরও সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৭৭ দশমিক সাত শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছেন দেশটির নির্বাচন কর্মকর্তারা।

সরকার কীভাবে গঠিত হবে?

ইসরায়েলের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, দেশটিতে কোনো দল কখনোই এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। যার ফলে সবসময় একটি জোট সরকার গঠিত হয়েছে।

ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরেই মূলত জোট সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এক্ষেত্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি ওই দলের নেতাদের ডেকে পাঠান, যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন।

এরপর সেই প্রার্থীকে জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। তবে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হলে তিনি ১৪ দিনের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন।

এই সময়ের মধ্যে তিনি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি দ্বিতীয় সম্ভাবনাময়ী দলকে জোট গঠনের চেষ্টার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।

সেটাও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে নেসেটের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে তৃতীয় কোনো নেতাকে চেষ্টা করার অনুমতি দিতে অনুরোধ করতে পারেন।

তৃতীয় চেষ্টাও অসফল হলে তখন নতুন করে নির্বাচন করার জন্য আহ্বান করার বিধান রয়েছে।

২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচটি আলাদা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কারণ দলগুলো বারবার জোট গঠনে হিমশিম খেয়েছে।

২০২২ সালের নির্বাচনের পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ১২০টি আসনের মধ্যে ৩২টিতে জিতে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

পরবর্তীতে তিনি বেশ কয়েকটি কট্টর-ডানপন্থী দলের সাথে একটি জোট গঠন করেন, যা তাকে ও তার মিত্রদের ৬৪টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছিল।

নেতানিয়াহুকে রাজনীতি ছাড়ার আহ্বান

নেতানিয়াহু বলেছেন, বর্তমান ফলাফল দেখে এখনই কিছু বলা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি 'প্রকৃত ফলাফলের' জন্য অপেক্ষা করছেন।

বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, তার জোট তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে সমানে সমানে রয়েছে।

তিনি বলেন, 'আরব সমর্থনে' টিকে থাকা কোনো সরকার ইসরায়েলকে পরিচালনা করতে পারে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে 'ইরানের হুমকি চিরতরে নির্মূল করার একটি অনন্য সুযোগ" ইসরায়েলের সামনে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু।

অন্যদিকে, ফল ঘোষণার পর নিজের দলীয় কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধী জোটের নেতা ও ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট।

"এটা স্পষ্ট যে দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এবং নেতানিয়াহুর ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে," চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন আইজেনকোট।

আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে মানুষের অনাস্থা মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের এত বড় উপস্থিতির পর আবার নতুন করে নির্বাচন দেওয়াটা মারাত্মক ভুল হবে।

আইজেনকোট ঘোষণা দেন, তিনি সবাইকে নিয়ে একটি দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সরকার গঠন করতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তার সরকার সবার জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করবে এবং হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করতে কাজ করবে।

কে এই আইজেনকোট?

গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের 'ইয়াশার পার্টি'র শীর্ষ নেতা। তিনি দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান।

রাজনৈতিকভাবে আইজেনকোট তুলনামূলক নতুন একজন ব্যক্তি। তিনি ২০২২ সালে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির হয়ে নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) সদস্য হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

পরবর্তীতে তিনি আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে দলটি ত্যাগ করেন।

গত বছর বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের মধ্যপন্থী দল 'ইয়াশার' (যার অর্থ 'সোজা' বা 'সৎ') গঠন করার পর থেকে আইজেনকোট নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত হয়েছেন, যে অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন এবং ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবরের হামলা মোকাবেলায় তার ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

এছাড়াও বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজানোর বিতর্কিত সংস্কারের বিষয়টিও রয়েছে, যা ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

কিন্তু নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আইজেনকোটের নিজস্ব সংকল্পের পেছনে ব্যক্তিগত দুঃখজনক ঘটনাও প্রেরণা যুগিয়েছে।

আইজেনকোটের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, মাস্টার সার্জেন্ট গাল আইজেনকোট, সাতই অক্টোবর হামাসের হাতে বন্দি হওয়া দুই ইসরায়েলি জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধারের একটি অভিযান চলাকালে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজায় এক বিস্ফোরণে নিহত হন।

গাল গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা তার করণীয় তালিকার অন্যতম। ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবরের ঘটনার পর, জাতীয় ঐক্যের নিদর্শন হিসেবে আইজেনকোট অন্যান্য বিরোধী নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।

তিনি ২০২৪ সালের জুন মাসে পদত্যাগ করেন এবং নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করেন যে, হামলার সময় হামাসের হাতে অপহৃত জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে তিনি আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেননি।