আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও আল কায়েদা ইস্যু আবার কেন আলোচনায়?
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের একাধিক জায়গায় কয়েক মাসের মধ্যে বোমা কিংবা বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। এরমধ্যেই, সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে।
ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে এসেছে এবং এক ধরনের উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।
এই ইস্যুতে আতঙ্কিত না হওয়ার কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। তাদের দাবি, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার কোনো শঙ্কা এখন নেই।
তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যেটা বলা হয়েছে- বাংলাদেশে নিজেদের স্থায়ী ঘাঁটি ও গোপন সেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে আল কায়েদা, এটি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
কিন্তু, বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, নব্য জেএমবি সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ এবং সবশেষ আল কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের বার্তা- এসব ঘটনা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ভালো বার্তা দেয় না বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, এখনো বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও গোয়েন্দা নজরদারিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো উচিত।
এছাড়া, এসব তৎপরতার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো কোনো কৌশল রয়েছে কি না- সেটিও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা আছে
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের 'অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম'-এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস নিয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, একিউআইএস একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হচ্ছে। বড় ইউনিটের বদলে তারা এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কাজ করছে।
এর পাশাপাশি সংগঠনটি শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
একিউআইএস-এর কর্মকাণ্ডের একটি উদাহরণ হিসেবে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার বিষয়টি প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে হওয়া ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটিকে দায়ী করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- সংগঠনটি বাংলাদেশে তাদের সেল গঠনের চেষ্টা করছে, এই তথ্য প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইউএনএসসি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একিউআইএস-এর শীর্ষ নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে। তাদের তাজকিরা (তালেবানের দেওয়া পরিচয়পত্র) দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ১০ই অগাস্ট প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনে, ২০২৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের নয়ই জুন পর্যন্ত আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় শঙ্কা বেড়েছে
জাতিসংঘের রিপোর্টের আগেই গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে, যেখানে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে একসময় বাংলাদেশে আলোচিত ও নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কার্যক্রম। নব্য জেএমবির একটি চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ১২ই অগাস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট। সেখান থেকে ৯টি বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এর আগে, গত ৩০শে জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
এছাড়া ২৪শে জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমাও উদ্ধার করে পুলিশ।
এসব ঘটনাক্রমের মধ্যেই কদিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছিল বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তর।
গত এপ্রিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছিলেন যে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।
কিন্তু, সম্প্রতি সাভারে একটি বাড়িতে অভিযান ঘিরে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির তৎপরতার তথ্য এবং বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে ইউএনএসসি-এর প্রতিবেদন নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার কোনো শঙ্কা এই মুহূর্তে নেই।
"আমরা তো প্রতিটা ঘটনাই তদন্ত করছি। আমরা বলছি যে আতঙ্কিত হওয়ার কিংবা নাশকতার আমরা কোনো আশঙ্কা দেখছি না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
সম্প্রতি বোমা বা বিস্ফোরক উদ্ধারের যে-সব ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আল কায়েদার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না- সেটি যাচাই করা হচ্ছে বলেই জানান সিটিটিসি প্রধান।
"আল কায়েদার কোনো যোগসূত্র আছে কি না সেটাও আমরা দেখছি। তদন্ত চলছে, তদন্তের পরই বলা যাবে," বলেন মি. হক।
তবে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা বা সেল গঠনের চেষ্টা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে দাবি করেছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি পুলিশের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, "আল কায়েদা ইস্যুতে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই, এটা সরকার কমেন্ট করবে।"
সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
জঙ্গি আছে, নাকি নেই?
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আলোচনা নতুন নয়। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় সিরিজ বোমা হামলাসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছিল।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন সময় এ ধরনের তৎপরতার তথ্য আসে।
পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কারাগার থেকে কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া জঙ্গিবাদের মামলায় আটক এমন অনেকে পরবর্তীতে জামিনেও মুক্তি পেয়েছেন।
বোমা বা বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের যে-সব খবর সম্প্রতি সামনে এসেছে, সেগুলো অপেক্ষাকৃত 'হালকা' ঘটনা মনে হলেও এখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে।
বিশেষ করে, আল কায়েদা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যে বার্তা দিয়েছে, সেটি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখার কথা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলছেন, "ওইভাবে বড় ঘটনা এখনো ঘটেনি। প্রেশার কুকার-ছাতা-পাইপ এগুলোতে আনকনভেনশনাল ওয়েতে তৈরি এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো দেখে বোঝা যায় যে অর্থের জোগান দিচ্ছে বাইরে থেকে।"
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বর্তমান যুগে জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদ বিশ্বজুড়ে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, সেখান থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকাটা বেশ কঠিন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একটি দেশে বিভিন্ন দেশের নানামুখী স্বার্থ জড়িত থাকায় নানামুখী তৎপরতাও রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদ বলছেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়েই প্রক্সি যুদ্ধের যে প্রচলন চলছে, তাতে অন্য দেশ থেকে নিজের স্বার্থ হাসিলে কৌশলগত অনেক পদক্ষেপই নিচ্ছে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দেশগুলো।
"ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করে হুথি, হেজবুল্লাহর মতো সংগঠকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। একইভাবে যারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলতে চায় তারা কোনো সংগঠনের পেছনে অর্থায়ন করবে এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করবে এটাও অস্বাভাবিক নয়," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
"ইসলাম প্রতিষ্ঠার একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মূলত সরকার বিরোধী এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির যে অপচেষ্টা, সেটাকে সাধন করার একটি চেষ্টা থাকতে পারে," বলেও মনে করেন মি. আহমদ।
জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তার মতে, পাঁচই অগাস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিতে পারে।
"বাংলাদেশ জঙ্গি তৎপরতা নেই, এটি বলার সুযোগ নেই," বলেই মনে করেন তিনি।
মি. লিটন বলছেন, কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে এমন কিছু ব্যক্তি পাঁচ অগাস্টের পর বেরিয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে উগ্র গোষ্ঠীর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আগে থেকেই ছিল।
"কেবল ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, এর বাইরেও যে উগ্রবাদ রয়েছে, তাদের বিচরণের একটা মোক্ষম সময় হিসেবে এটিকে (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে) বেছে নিতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এছাড়া দেশের রাজনীতিতে অতীতে যাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাদের উগ্রভাবে ফেরত আসার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে এখনো সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই বলেও মত এই মানবাধিকারকর্মীর।