ট্রাম্পের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা হুমকির পর ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল জি-৭

এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এর বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন
ছবির ক্যাপশান, এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এর বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

সরবরাহ সংকটের কারণে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার জি-৭ জোট বাজারে দশ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর এই জোটে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। তারা জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হতে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর দামের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এর ফলে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে ডিজেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।

এক যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ দেশগুলো বলেছে, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও জ্বালানি-জাতীয় পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকবে।

এই জোটের সদস্য দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করে।

ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মজুত থেকে আরও জ্বালানি বাজারে না ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, "ইউরোপ তাদের বিপুল পরিমাণ মজুত ডিজেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হবে।"

মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এর আগে বলেছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পুরো বোঝা যেন মার্কিন কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর না পড়ে।

পরিবহন ও কৃষিকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, পরিবহন ও কৃষিকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পরিবহন ও কৃষিকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে খাদ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।

তবে জি-৭ নেতাদের বৈঠকের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ জানান, জোটটি চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দশ কোটি ব্যারেল জ্বালানি মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

এই কার্যক্রম আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বা আইইএ -এর সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, এসব পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করবে, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে এবং পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেবে।

ম্যাক্রঁ বলেছেন, সমন্বিত এই পদক্ষেপের ফলে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমবে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট ছিলেন।"

পরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি 'আসলে কখনোই টেবিলে ছিল না'।

জি-৭ এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে: "আমরা আইইএ-র মাধ্যমে চার মাস ধরে সমন্বিতভাবে ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব। কার্যক্রম এই অবিলম্বে শুরু হবে। এর মধ্যে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই জি-৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়বে"।

তবে কোন কোন অংশীদার দেশ তাদের মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়বে এবং কত দ্রুত তা করবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ডোনাল্ড ট্রাম্প

দশ কোটি ব্যারেলের এই মজুতের মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল- দুটিই থাকবে।

বিশ্ববাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের নিচে নেমে গেলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় আবার প্রায় ১০২ ডলারে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে এর দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার।

কেপলার- এর কমোডিটি গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার গুজবের কারণে তেলের দাম আবার বেড়েছে।

" ইউরোপ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার ঘোষণার পর তেলের দাম দ্রুত কমছিল। কিন্তু সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দাম আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এর লক্ষ্য হতে পারে বাব-আল-মান্দেব নৌপথকে নিরাপদ করা," বলেছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও চীন থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার হুমকির বিরোধিতা করেছিল।

জি-৭ নেতারা আরও বলেছেন, তারা রিফাইনারিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচী সমন্বয় করবেন, যাতে একই সময়ে একাধিক রিফাইনারি বন্ধ না থাকে। একই সঙ্গে যেসব দেশের অতিরিক্ত পরিশোধন সক্ষমতা রয়েছে, তাদের বিশেষ করে ডিজেল উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করা হবে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে

মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ না হওয়া যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বিষয় হবে, কারণ তারা ডিজেল আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। শুক্রবার যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো পাম্পে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ২ পাউন্ডের বেশি হয়।

যুক্তরাজ্যের ব্যবহৃত ডিজেলের অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ৩১ শতাংশ আমেরিকা থেকে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল সরবরাহকারী দেশ। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রিফাইনারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪/৫ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি উৎপাদন করে।

এর মধ্যে আমেরিকানরা প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল ব্যবহার করে। বাকি প্রায় ১ দশমিক২ থেকে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন রপ্তানি করা হয়। ফলে বৈশ্বিক ডিজেল বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেল- দুটোরই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়াও ডিজেলের অন্যতম বড় উৎপাদক। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি রিফাইনারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি নিজস্ব ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমেছে।

জি-৭ নেতারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

ডিজেল পরিশোধন করা পেট্রোলের তুলনায় বেশি জটিল। পাশাপাশি পরিবহন ও কৃষিতে ডিজেলের ব্যাপক প্রয়োজন থাকায় এর চাহিদা দ্রুত কমানোও কঠিন।