পেশোয়ারে স্কুলের ছাদ ধসে ৩৩ শিশু ও একজন শিক্ষক নিহত

ধসে পড়া ছাদের ধ্বংসস্তূপ, যেখানে কয়েকটি ফ্যান ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরে একটি স্কুলের ছাদ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে পৌঁছেছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের দির কলোনি এলাকায় আল খাইর নামে একটি বেসরকারি স্কুলে আজ বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে ৩৩ জন শিশু ও একজন শিক্ষক রয়েছেন।

স্থানীয় লেডি রিডিং হাসপাতাল ৩৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে নাসিরুল্লাহ খান বাবর হাসপাতাল একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

লেডি রিডিং হাসপাতালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৩৩ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষক সামরিন বিবিও রয়েছেন। হাসপাতালে আনা শিশুদের বয়স ছয় থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।

লেডি রিডিং হাসপাতাল থেকে ১৭ শিশুকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে একজন শিক্ষক ও তিন শিশু এখনো সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

অন্যদিকে নাসিরুল্লাহ খান বাবর মেমোরিয়াল হাসপাতাল জানিয়েছে, সেখানে ৩৩ জন ছাত্রছাত্রীকে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে, রেসকিউ ১১২২-এর আঞ্চলিক পরিচালক আরিফ খাত্তাক জানিয়েছেন, স্কুল ভবন ধসে পড়ার পর উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। তার তথ্যমতে, ঘটনাস্থল থেকে একজন নারী শিক্ষকসহ মোট ২৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এক বার্তায় তিনি বলেন, "ভবনটি ধসে পড়ার পর প্রাথমিকভাবে ১৬টি মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছিল। এরপর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে অভিযান চলে এবং শেষ পর্যন্ত ২৯টি মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন।"

তিনি আরও বলেন, "প্রথমে আমাদের জানানো হয়েছিল যে ভবনটি ধসে পড়েছে। কিন্তু এখানে পৌঁছানোর পর আমরা জানতে পারি, এটি তিনতলা একটি ভবন ছিল।"

"এই তিনতলা ভবনটি ছিল অস্থায়ী কাঠামোর... গুরুতর আহত হয়েছেন ৪৫ জন। তাদের প্রদেশের বড় হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।"

আরিফ খট্টক জানান, এই উদ্ধার অভিযানে ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, ১৮টি অ্যাম্বুলেন্স এবং তিনটি ভারী যান অংশ নেয়।

স্কুলটির উদ্ধারকাজে স্থানীয় মানুষজন অংশ নেন
ছবির ক্যাপশান, স্কুলটির উদ্ধারকাজে স্থানীয় মানুষজন অংশ নেন
পেশোয়ারে ধসে পড়া স্কুল ভবনে উদ্ধারকাজ চলছে
ছবির ক্যাপশান, পেশোয়ারে ধসে পড়া স্কুল ভবনে উদ্ধারকাজ চলছে

বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতা বিলাল আহমেদ জানান, পেশোয়ারের কর্তৃপক্ষ দুপুরের দিকে জানিয়েছে যে স্কুল ভবন ধসে পড়ার পর উদ্ধারকাজ শেষ হয়েছে। তবে সেখানে এখনো ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে।

পুলিশ জানিয়েছে, স্কুলটির মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিলাল আহমেদ ঘটনাস্থল থেকে আরো জানিয়েছেন, স্কুলটি একটি তিন তলা ভবনে অবস্থিত। ভবনটিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে তৈরি ছাদের বদলে অস্থায়ী ছাদ ছিল বলে মনে হচ্ছে।

ধ্বংসাবশেষ দেখে ধারণা করা যায়, ওপরের একটি কক্ষের ছাদের ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ার পর সেটিই নিচতলায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের ওপর গিয়ে পড়ে।

স্কুলটির সামনে মানুষের ভিড়
ছবির ক্যাপশান, ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে

এদিকে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, "এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে।"

প্রেসিডেন্ট নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানিয়েছেন বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট "আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন"। এছাড়া তিনি ঘটনার কারণ নির্ধারণে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন।

পেশোয়ারের দির কলোনি এলাকায় এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করার পাশাপাশি তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

প্রাদেশিক গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন।

স্কুলটির সামনে ভিড় করেছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ অনেকে
ছবির ক্যাপশান, স্কুলটির সামনে ভিড় করেছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ অনেকে

সরু রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজে সমস্যা

ঘটনাস্থলে পৌঁছানো বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতা বিলাল আহমেদ জানিয়েছেন, স্কুলটি শহরের এমন একটি সরু গলির মধ্যে অবস্থিত, যেখানে একবারে মাত্র একটি গাড়ি চলাচল করতে পারে। এ কারণে উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধারকাজ চালাতে এবং আহতদের হাসপাতালে নিতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সোহাইল বিবিসিকে বলেন, "আমার বোন আমাকে ফোন করে বলেছিল, 'ভাই, তাড়াতাড়ি আসো'। স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা ছাদের নিচে চাপা পড়েছিল। আমি এবং এলাকার লোকজন দ্রুত কোদাল দিয়ে তাদের বের করার চেষ্টা করি।"

উদ্ধারকাজ এখনো চলছে এবং স্কুলটি বা সেখারকার কারো সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, এমন ব্যক্তিদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

এর আগে পেশোয়ারের উদ্ধার কর্মকর্তা বিলাল ফাইজি বলেন, "আজ সকালে ৮টা ৪৮ মিনিটে নিয়ন্ত্রণকক্ষে খবর আসে যে স্কুলটির ছাদ ধসে পড়েছে। আমরা সেখানে পৌঁছে দেখি, ভবনটির একটি ছাদ আরেকটি ছাদের ওপর ধসে পড়েছে। ওই শ্রেণিকক্ষের শিশুরা এর নিচে চাপা পড়ে।"

স্কুলটির দুটি ছাদ ধসে পড়েছে
ছবির ক্যাপশান, স্কুলটির দুটি ছাদ ধসে পড়েছে

ধসের পেছনে 'চরম অবহেলা' দেখছে পুলিশ

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পেশোয়ার পুলিশের কর্মকর্তা মিয়া সাঈদ ধসে পড়া স্কুল ভবনটি সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, অত্যন্ত সরু একটি গলিতে থাকা তিনতলা ওই ভবনের ছাদের স্ল্যাবগুলো ছিল নিম্নমানের।

প্রতিটি তলায় একটি করে মোট তিনটি শ্রেণিকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কক্ষে প্রায় ১১০ জন শিক্ষার্থী ছিল। ওপরতলার শ্রেণিকক্ষে ৩০ জন, মাঝের তলায় ৪০ জন এবং নিচতলায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী ছিল।

সাঈদ বলেন, পুরো কাঠামোটির ওপর ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ভার ছিল এবং কংক্রিটের স্ল্যাব বা লিন্টেল কতটা ওজন বহন করতে পারে, তার একটি সীমা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, "আমরা এখনো লোকজনকে সরে যেতে বলছি, কারণ ভবনটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আরও ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটি চরম অবহেলার ঘটনা।"

"ভবন নির্মাণের বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছিল কি না, আমরা তা খতিয়ে দেখব। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে এবং সব তথ্য সংগ্রহ করতে চাই।"

এর আগে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, আল-খাইর স্কুলের মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পেশোয়ার পুলিশের অপারেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ সুপারিনটেনডেন্ট ফারহান আহমেদ বলেন, দির কলোনির আল-খায়ের স্কুলটির অবস্থা ছিল "অত্যন্ত জরাজীর্ণ"।

তিনি জানান, স্কুলটিতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধসে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষে তখন প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী ছিল।

আহমেদ বলেন, ভবনটি আগে পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে পুলিশ।