ব্রাজিলের 'হেক্সা স্বপ্ন' কি এবার পূরণ হবে যুক্তরাষ্ট্রে?

Published
পড়ার সময়: ১০ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্রে যখন প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপের আসর বসে ১৯৯৪ সালে, সেইবার ব্রাজিল ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে। আর কিছুদিন পর শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ সালের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এবার অবশ্য সহ-আয়োজক কানাডা ও মেক্সিকো। আর এবারও ব্রাজিল বিশ্বকাপে আসছে ঠিক ২৪ বছর শিরোপা শূন্য থাকার পর। তবে, যুক্তরাষ্ট্র কি ব্রাজিলের জন্য আবার সৌভাগ্য বয়ে আনবে?

বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সফলতম দল ব্রাজিল। এই পর্যন্ত দলটি পাঁচবার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪, ২০০২) বিশ্বকাপ জিতেছে এবং ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার জয়ের পর আজীবনের জন্য বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি জুলে রিমে ট্রফিটি নিজেদের করে নিয়েছে।

অথচ দলটি সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই ২০০২ সালে।

সে বছর জাপানের ইয়োকোহামায় রোনালদো যখন জার্মানির বিপক্ষে দুটো গোল করে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরলেন, পুরো ব্রাজিল রাস্তায় নেমে এসেছিল।

জোগো বনিতা বা সুন্দর ফুটবলের জন্য বিখ্যাত, ব্রাজিলের দুনিয়াব্যাপী সমর্থকেরা সেইদিন থেকে একটি পর্তুগিজ শব্দ জপে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন। হেক্সা, অর্থাৎ ছয়।

কিন্তু, প্রতিবারই হেক্সা মিশনে গিয়ে ব্রাজিল খালি হাতেই ফিরেছে। এবার কি দলটি পারবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে?

ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়। এটা তাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ, তাদের আত্মার প্রশ্ন। সুবিশাল এই দেশটি নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ।

সেদেশের কালো মানুষদের বংশধরদের আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে আনা হয়েছিল। দেশটির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়াল। কিন্তু, ফুটবলের মাধ্যমে সেই দেশটি বিশ্ব দরবারে নিজেদের গৌরব তুলে ধরে। পায় দারুণ এক আত্মপরিচয়।

দরিদ্র ঘরের লিওনিদাস থেকে শুরু করে পেলে, গারিঞ্চা, ভাভা, সক্রেটিস, জিকো,রোমারিও, রোনালদোরা ব্রাজিলের ইতিহাসের একেকটা উজ্জ্বল নাম। বস্তি বা ফাভোলা থেকে উঠে আসা ব্রাজিলীয় ফুটবল কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে, ব্রাজিলের গল্প কেবল রোমান্টিকতা আর মিথেরই নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দেশটি নিজেদের ফুটবলের উন্নতি করেছে নিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

লিওনিদাস আর পেলের মতো হতদরিদ্র ঘরের সন্তানেরা ফুটবল খেলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে, আর সে ব্যাপারে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েছে সবসময়।

সেই ৫০ এর দশকের থেকেই ব্রাজিলীয়রা ফুটবলারদের উন্নয়নের জন্য কাঠামো নির্মাণ করেছে, তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। অবশ্য, ব্রাজিলের জন্য জাতীয় দুর্যোগ হয়ে আসে ১৯৫০ সালে।

সেবার নিজেদের মাটিতে টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে (সেবার ফাইনাল বলে কিছু ছিলো না) উরুগুয়ের সাথে ড্র করলেই দলটি প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতো। অথচ প্রায় লাখ দুয়েক দর্শকের সামনে মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ২-১ গোলে হেরে যায়। গোটা দেশ শোকাভিভূত হয়ে পড়ে।

তবে, শোককে শক্তিতে রুপান্তর করে আট বছর পর ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। তাও সেটা ইউরোপের দেশ সুইডেনে। আর সেটাই ছিলো ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দলের ভিন্ন মহাদেশে বিশ্বকাপ জেতা।

তবে, এর চেয়েও বড় অর্জন সম্ভবত ছিলো আঠারো বছরের যুবক পেলের আবির্ভাব। পরের তিন আসরের দুটিতেই চ্যাম্পিয়ান হয় পেলে, গারিঞ্চাদের দলটি। গোটা বিশ্ব ব্রাজিলের খেলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়।

বলা চলে যে, ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস রোমান্টিকতা, ট্র্যাজেডির এবং দারুণভাবে ফিরে আসার। ফলে, সমর্থকেরা আশা করবেন, দলটি খারাপ সময় পার করে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।

ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসার মতো মারাকানা ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হয়েছিল ২০১৪ সালে। সেবার নিজেদের মাটিতে বেলো অরিজোন্তেতে জার্মানির কাছে ৭-১ হার।

ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসে এটা "মিনেইরাজো" নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। এর পরেরবার, ২০১৮ বিশ্বকাপে নেইমারের নেতৃত্বে শক্তিশালী দল নিয়ে গিয়েও বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়।

২০২২ কাতারে গ্রুপ পর্যায় থেকে দুর্দান্ত শুরু, শেষ ষোলোতে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-১ এ উড়িয়ে দেওয়া, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টিতে বিদায়। প্রতিবারই মনে হয়েছে এবার হবে, প্রতিবারই হয়নি।

এই বারবার হতাশার একটা বড় কারণ কৌশলগত পরিপক্কতার অভাব আর মানসিক দৃঢ়তার অভাব। প্রতিভার কমতি এই দেশটির কখনোই ছিলো না, কিন্তু, ৬০ এর দশকের পেলে, গারিঞ্চারা যেভাবে বিশ্বজয় করেছিল, তা করে উঠতে পারছে না মাঠে সবাই মিলে একই তালে বেজে উঠার অভাবে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণে।

আর এই সমস্যার কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবল ফেডারেশন নিজেদের ঐতিহ্য ভেঙে দ্বারস্থ হয়েছে এক বিদেশি কোচের। ইতালীয় কিংবদন্তি কার্লো এনচেলোত্তির। খেলোয়াড় হিসেবে যথেষ্ট সফল ছিলেন, তবে কোচ হিসেবে নিজের সময়ে সেরাদের সেরা হয়েছেন।

কোচ হিসেবে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে সম্মানজনক টুর্নামেন্ট ইউসিএল জিতেছেন পাঁচবার, যা আর কেউ তিনবারের বেশী জিততে পারেনি। এখনও পর্যন্ত একমাত্র কোচ হিসেবে ইউরোপের সেরা পাঁচটি লীগ (ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স) জিতেছেন।

আর এই সফলতা পাবার পেছনের কারণ কেবল কৌশলগত দক্ষতা ও জ্ঞান নয়, বরং তিনি এমন একজন মানুষ যিনি চাপের মধ্যে শান্ত থাকতে জানেন। প্রায় সময়ই দেখা যায় দল গভীর বিপদে, অথচ ডন কার্লো নামে পরিচিত এই ইতালীয় একদম শান্ত, নিশ্চল।

অন্য অনেক কোচের মতো খেলোয়াড়দের সাথে উত্তেজনা না দেখিয়ে, চেঁচামেচি না করে কেবল হয়ত একটু চোখ নাচাচ্ছেন কিংবা গম্ভীর একটা চাহনি। বহুবার এমন হয়েছে যে, এতেই খেলোয়াড়েরা প্রতিকূলতার বিপরীতে জয় ছিনিয়ে এনেছেন।

আনচেলোত্তির খেলোয়াড়েরা উদ্দীপ্ত হয় কারণ তিনি খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন। তিনি জানেন কখন কাকে বিশ্রাম দিতে হবে, কখন কাকে দিয়ে ম্যাচ পালটাতে হবে।

ব্রাজিলের মতো একটা দলের জন্য, যেখানে অহং এবং তারকায় পরিপূর্ণ, এই মানবিক দক্ষতাটা হয়ত সবচেয়ে জরুরি। আনচেলত্তি ইতোমধ্যে সেটা দেখিয়েছেন। নেইমারকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে থিয়াগো সিলভাকে বাদ দেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে, তিনি আবেগের চেয়ে বিচারবুদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

একটু বেশী বয়সিদের নিয়ে দল করায় সমালোচনার মুখোমুখি হলেও আনচেলত্তি জানেন কীভাবে ফল আদায় করে নিতে হয়।

ফলত, এই কথা বলা যায় যে, ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে কার্লো আনচেলত্তি।

তবে, মাঠে তো খেলতে হবে খেলোয়াড়দেরই। আনচেলোত্তির দলে সমারোহ অনেক বিশ্বসেরারই। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আলিসন বেকার।

এই গোলরক্ষক লিভারপুলে বছরের পর বছর শীর্ষ পর্যায়ের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করেছেন বড় মঞ্চে তিনি ভরসার জায়গা। কোচের মতোই তিনি যেন বড় আসরে বেশি জ্বলে উঠেন, নির্ভরতার প্রতীক হয়ে যান।

ব্রাজিলের রক্ষণভাগ বেশ অভিজ্ঞ। মার্কুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের জুটি এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা সেন্টার-ব্যাক জুটিগুলোর একটি। মার্কুইনহোস পিএসজিতে বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ খেলছেন, দলের মেরুদণ্ড তিনি। গ্যাব্রিয়েল আর্সেনালে এই মৌসুমে আরও পরিণত হয়েছেন, সেট-পিসে গোলও করতে পারেন।

চলতি মৌসুমে দুজনের দল কেবল যার যার লীগই চ্যাম্পিয়ান হয়নি, দুইটি দলই ইউসিএলের ফাইনালেও উঠে গেছে। এহেন দুটি দলের রক্ষণের প্রাণভোমরারা যখন ব্রাজিলের রক্ষণভাগ সামলাবেন তখন তা ভাঙতে প্রতিপক্ষের অনেক কষ্ট করতে হবে।

রক্ষণের অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্রেমার জুভেন্তুসে বেশ কিছুটা সময় চোটে কাটিয়েছেন, কিন্তু ফিট থাকলে তিনি চমৎকার বিকল্প। ফুলব্যাক পজিশনে রোমার ওয়েসলি ডানদিকে এবং আলেক্স স্যান্ড্রো বাঁদিকে রয়েছেন।

তবে ফুলব্যাক পজিশন এই দলের তুলনামূলক দুর্বল জায়গা, বিশেষ করে যখন উইঙ্গাররা সামনে এগিয়ে থাকবেন, তখন পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে।

ব্রাজিল বরাবরই সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডারদের জন্য বিখ্যাত। নিউক্যাসলে খেলা ব্রাজিলীয় ব্রুনো গিমারাইস এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার।

প্রিমিয়ার লীগে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা গিমারাইস বল ধরে রাখা থেকে শুরু করে প্রেস করা, ডিফেন্স করা, সবকিছুতেই তিনি পারদর্শী। কাসেমিরো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ভালো সময় কাটাননি ঠিকই, কিন্তু জাতীয় দলে এবং বড় টুর্নামেন্টে তিনি সবসময় অন্যরকম।

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে পাঁচ পাঁচটি ইউসিএল জেতা এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জানেন কীভাবে বড় আসর জিততে হয়। লম্বা সময় আনচেলত্তির অধীনে খেলার কারণে তিনি কোচ ও দলের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটাও করতে পারবেন।

লুকাস পাকেতা ফ্লামেঙ্গোতে ফিরে নতুন জীবন পেয়েছেন। পাকেতা যখন ছন্দে থাকেন তখন মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরিতে তার জুড়ি নেই।

আরেক অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ফাবিনহো হয়ত তেমন সুযোগ পাবেন না, তবে হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে লিভারপুলের এই প্রাক্তন খেলোয়ারটি দলে প্রচুর অভিজ্ঞতা যুক্ত করবেন।

আক্রমণভাগেও ব্রাজিল ভীষণ শক্তিশালী। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা উইঙ্গারদের একজন, অনেকের মতে একদম শীর্ষে। রিয়াল মাদ্রিদে তিনি সিরিয়াল উইনার। যে কোনো অবস্থা থেকে বহুবার তিনি বড় ম্যাচ বের করে এনেছেন। গতি, ড্রিবলিং, শেষ মুহূর্তে গোল, সবকিছুতেই তিনি বিধ্বংসী।

যদিও এই বছরটা একটু ম্লান গেছে, তবে ভিনি নিশ্চিতভাবে উদ্দীপ্ত থাকবেন বিশ্বকাপে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য।

রাফিনহা কেবল দারুণ সৃষ্টিশীল নন, তিনি একাধিক পজিশনেও খেলতে পারেন। বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। গোল, অ্যাসিস্ট, কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে টেনে তোলা, সবকিছুতে তিনি অবিশ্বাস্য। জাতীয় দলেও এই ফর্ম তুলে আনতে পারলে তিনি হবেন ভিনিসিয়ুসের সমান বিপজ্জনক।

গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি আর্সেনালে স্থির হতে পারেননি, তবে তার হাই প্রেস এবং দৌড়ের ক্ষমতা আনচেলত্তির কৌশলে দারুণভাবে মানানসই। মাতেউস কুনহা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এই মৌসুমে ভালো খেলেছেন, তার বহুমুখিতা কাজে লাগবে। আর মাত্র ১৮ বছর বয়সি এন্ড্রিক হয়ে উঠতে পারেন এই বিশ্বকাপের চমক।

তবে এদের ছাপিয়ে এই দলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নেইমার। নেইমারকে নিয়ে কথা বলা যতটা সহজ, তাকে মূল্যায়ন করা ততটা কঠিন। ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ৭৯ গোল, বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান ফুটবলার, কিন্তু বিগত কয়েক বছর একটার পর একটা চোটে জর্জরিত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসিএল চোটের পর থেকে তিনি কার্যত আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন। সান্তোসে ফিরে এসে অনেকটা নতুন জীবন পেয়েছেন।

সান্তোসের রেলিগেশন লড়াইয়ে আহত শরীর নিয়েও জুভেন্তুদের বিপক্ষে যে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, সেটা দেখিয়ে দিয়েছিল ফর্ম টেম্পরারী হলেও ক্লাস পারমানেন্ট। স্কোয়াড ঘোষণার আগে চার ম্যাচে তিনটি গোল তার ফর্মকেও নতুন করে প্রমাণ করেছে। আনচেলত্তি বললেন, "আমরা সারা বছর তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, সে ধারাবাহিকতা ফিরে পেয়েছে।"

নেইমার সম্ভবত শুরুর একাদশে থাকবেন না। কিন্তু একজন ম্যাচ-পরিবর্তনকারী বিকল্প হিসেবে তার মূল্য অনেক বেশি। নকআউট পর্যায়ে যখন ম্যাচ আটকে যাবে, তখন নেইমারের মতো একজন যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন। তবে এই সবকিছুর পূর্বশর্ত হলো তিনি ফিট থাকেন কিনা।

আনচেলত্তির কৌশলগত পরিকল্পনা

আনচেলত্তির কৌশলের মূল ভিত্তি হলো নমনীয়তা। তিনি ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ উভয় ফর্মেশনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু তার আসল শক্তি হলো : প্রতিপক্ষ অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানো, প্রথম লেগে এক ধরনের খেলা, দ্বিতীয় লেগে ভিন্ন, প্রয়োজনে কাউন্টার-অ্যাটাক কেন্দ্রিক হওয়া।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই দলে কোনো ঐতিহ্যগত নয়-নম্বর স্ট্রাইকার নেই। জোয়াও পেদ্রোকে বাদ দেওয়া সেই বার্তাই দিচ্ছে। আনচেলত্তি চান সামনের তিনজন মুক্তভাবে চলাফেরা করুক, নির্দিষ্ট পজিশনে আটকে না থেকে স্থান বদল করুক, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বিভ্রান্ত করুক। ভিনিসিয়ুস, রাফিনহা ও মার্তিনেলির মতো খেলোয়াড়দের জন্য এই স্বাধীনতা আসলে সুবিধাজনক।

মিডফিল্ডে ব্রুনো ও কাসেমিরো হবেন দলের মেরুদণ্ড; বল ধরে রাখবেন, পালটা আক্রমণ সামলাবেন এবং আক্রমণ থেকে রক্ষণে দ্রুত ফেরার পথটা নিরাপদ রাখবেন। এই দুইজন ডাবল পিভট গড়ে রক্ষণকে সুরক্ষা করার পাশাপাশি আক্রমণের জন্যও রাস্তা বানাবেন।

রক্ষণে মার্কুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েলের উপর নির্ভর করা যায়। আর, ব্রাজিলের জন্য আরেকটা দারুণ অস্ত্র হতে পারে সেটপিস। তবে, ফুলব্যাকদের ওভারল্যাপ করলে পেছনে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, সেটা দ্রুতগতির দলগুলো কাজে লাগাতে পারে। এই দুর্বলতা ঢেকে দেওয়া হবে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

গ্রুপ পর্যায় ও এর পরের পথ

ব্রাজিল গ্রুপ সি-তে রয়েছে মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ডের সাথে। হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল পরিষ্কার ফেভারিট, কিন্তু মরক্কো ভিন্ন প্রসঙ্গ। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছানো আফ্রিকার এই দলটা ভালো সংগঠিত, শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং সেট-পিসে বিপজ্জনক। মরক্কো ম্যাচটা হবে গ্রুপ পর্যায়ের সত্যিকারের পরীক্ষা।

আর সেই ম্যাচটি দিয়েই ব্রাজিলের যাত্রা শুরু হবে জুনের ১৩ তারিখ (বাংলাদেশ সময় ১৪ জুন ভোরে) ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। জুনের ১৯ এবং ২৪ যথাক্রমে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে ফিলাডেলফিয়া ও মিয়ামি গার্ডেনসে।

ব্রাজিলের জন্য দ্বিতীয় রাউন্ড যথেষ্ট কঠিন হবার কথা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান হলে তাঁরা খেলবে গ্রুপ এফ রানার্সআপের সাথে, যেই গ্রুপে আছে নেদারল্যান্ড, জাপান, সুইডেন এবং তিউনিশিয়া। গ্রুপে রানারআপ হলে এই গ্রুপ এফের চ্যাম্পিয়নের সাথে। অর্থাৎ দ্বিতীয় রাউন্ডেই নেদারল্যান্ড, জাপান বা সুইডেনের মতো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হতে হবে।

এর পরের রাউন্ডেই ফ্রান্স বা জার্মানীর মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা আছে। অবশ্য, সমর্থকেরা আশা করবে যে, গ্রুপে চ্যাম্পিয়ান হয়ে এবং দ্বিতীয় রাউন্ড জেতার পর ব্রাজিল শেষ ষোলোতে আইভরি কোস্ট বা সেনেগালের মতো দলকে পাবে। তবে, সেই দলগুলাও ব্রাজিলের শক্ত পরীক্ষা নেবে। আর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে তো অবধারিতভাবে টুর্নামেন্টের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধেই খেলতে হবে।

তবে, কাগজে-কলমে এই ব্রাজিল দল বিশ্বকাপ জেতার মতো সামর্থ্য রাখে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই। আনচেলত্তির অধীনে একটা দল হয়ে উঠলে এই দলটাকে আটকানো কঠিন হবে।