হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, 'ঝুঁকি' তৈরি করছে ভারতের অর্থনীতির জন্য

    • Author, সৌতিক বিশ্বাস
    • Role, বিবিসি ভারত সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার ফলে, সেখানে হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হওয়া হ্রদগুলো আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে হিমালয় অঞ্চল একটি বিপজ্জনক অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যার পর, যেখানে ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। ঘটনাগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে।

বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে হিমালয়ের হিমবাহগুলো ৬৫% দ্রুত হারে তাদের আকার হারাচ্ছে।

প্রতিবেদনটি ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং এতে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমড) এবং জি বি পন্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টির বিস্তারিত এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন করা হয়েছে।

ফলে হিমালয় অঞ্চলের অনেক হিমবাহ এই পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে।

তবে এই পর্যবেক্ষণের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানকার বাস্তব অবস্থা আসলে খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। ফলে সেখানকার অনেক কিছুই হয়তো নজরের বাইরে থেকে যেতে পারে।

হিমবাহ গলে গিয়ে সেসব স্থানে বড় আকারের হ্রদের সৃষ্টি হতে পারে, যেগুলো সাধারণত ভঙ্গুর পাথর ও বরফের স্তূপ দ্বারা আটকে থাকে।

একই সময়ে, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমাট মাটি এবং উচ্চ পার্বত্য ঢালগুলোও নাজুক হয়ে পড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব জমাট মাটি গলে যেতে পারে, যার ফলে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে ইতোমধ্যেই এই ঝুঁকির ব্যাপকতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মোট ভূমির প্রায় ১৮% হিমালয় অঞ্চল হলেও দেশের প্রায় ৩৫% দুর্যোগ এই অঞ্চলেই ঘটে।

ভারত সরকার জুলাই মাসে দেশটির সংসদকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের ১৮৯টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের পর ৫৬টি হিমবাহজাত হ্রদকে "অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ" হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

সরকার আরও জানিয়েছে, ভারতের হিমালয়ীয় নদী অববাহিকাগুলোতে ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২,৪৮৫টি হিমবাহ উদ্ভূত হ্রদ কেন্দ্রীয় পানি কমিশন পর্যবেক্ষণ করছে।

প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার ভয়াবহ উদাহরণ হিমালয়ে আগেও দেখা গেছে।

২০২৩ সালে সিকিমে একটি হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবনে অন্তত ৭০ জন নিহত হন এবং সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে একই ধরনের আরেকটি দুর্যোগে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যখন একটি বিশাল বন্যা ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা উপত্যকা দিয়ে বয়ে যায়।

তবে বিপদ কেবল বড় ধরনের বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার নয়।

হিমালয় একটি বিশাল প্রাকৃতিক জলব্যবস্থা, যা দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নদীগুলোকে পানি সরবরাহ করে।

আইসিমড বলছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের অধিকাংশ নদী অববাহিকায় এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে "পিক ওয়াটার" বা হিমবাহ-থেকে গলে আসা পানি প্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর হিমবাহের ভর কমে যাওয়ায় এ প্রবাহ হ্রাস পেতে শুরু করবে।

নতুন গবেষণাটি এই নির্ভরতার একটি বড় অর্থনৈতিক চিত্রও তুলে ধরেছে।

এতে ধারণা করা হয়, হিমালয়ের পানি ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০% ভিত্তি জোগায় এবং গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ ও নানা তীর্থকেন্দ্র ভিত্তিক অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে।

তবে এই মূল্যমানের মাত্র প্রায় ৫% পাহাড়ি রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে ধরে রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

"হিমালয় হলো তৃতীয় মেরু," বলেছেন জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিষয়ক গ্রানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ লর্ড নিকোলাস স্টার্ন।

"আর্কটিক বা অ্যান্টার্কটিকার মতো নয়, এই মেরুর নিচে শত শত মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে।"

"এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো," তিনি বলেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে, এ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা পরিবেশগত কাঠামোটি "একটি সংকটজনক মোড়ের কাছাকাছি" পৌঁছে যাচ্ছে।

হিমবাহ গলনের পেছনের সব কারণই যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা নয়।

সিস্টেমিকের গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ গলনের জন্য দায়ী ব্ল্যাক কার্বন, যার বড় অংশ সমতলের ইটভাটা থেকে উৎপন্ন হয়।

তুষার ও বরফের ওপর জমা হওয়া এই কালি বেশি সূর্যালোক শোষণ করে এবং গলন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের বিপরীতে ব্ল্যাক কার্বন দূষণ এমন একটি বিষয়, যার বিরুদ্ধে ভারত ও তার প্রতিবেশীরা সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে।

"হিমালয় একটি সংকটজনক মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে," বলেছেন সিস্টেমিকের সিনিয়র ডিরেক্টর এবং প্রধান লেখক অরুশি চোপড়া।

"এক দশক আগের তুলনায় হিমবাহ এখন দ্রুত গলছে।"

প্রতিবেদনে ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন নির্গমন কমানো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সম্প্রসারণ, দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং পাহাড়ে পর্যটন উন্নয়নের ধরন পরিবর্তন করা।

অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা, যাতে ঝুঁকি দেখা দিলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা সরকারগুলো আগেভাগেই নির্ধারণ করে রাখতে পারে। এর মধ্যে মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার বিষয়ও রয়েছে।

আরেকটি অগ্রাধিকার হলো পর্যটন নিয়ে নতুনভাবে ভাবা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক সফর করেন। গবেষকদের মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং এমন মূল্য তৈরি করা যা স্থানীয়ভাবে থেকে যায় এবং পুনঃবিনিয়োগ করা হয়।

আইসিমডের মহাপরিচালক পেমা গ্যাৎসো বলেন, ঝুঁকিগুলো ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, "হিমবাহের আকার আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, বরফ গলছে ও উচ্চ পার্বত্য ঢালগুলো আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে ভাটির দিকে থাকা জনসমাজ ও অবকাঠামো জটিল ও ধারাবাহিক বিপদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।"

আর এসব ঝুঁকি হিমালয় সংলগ্ন বিভিন্ন দেশের সীমানায় এসে থেমে থাকে না।

গ্যাৎসো বলেন, "এ ধরনের বিপদ জাতীয় সীমানা মানে না এবং কোনো একক দেশ একা এগুলোর মোকাবিলা করতে পারে না।"

তাই জীবন রক্ষা করার পাশাপাশি পাহাড়নির্ভর কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে সীমান্তপারের পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং যৌথভাবে সহনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে।