আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মিসির আলী, হিমু, রূপা- হুমায়ূন আহমেদের তৈরি যে তিন চরিত্র এখনো 'জীবন্ত'
- Author, হাবিবুল্লাহ সিদ্দিক
- Role, সাংবাদিক
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ফিনিক ফোঁটা, জোসনা আর লিলুয়া বাতাস- যার কলমের মাধ্যমে এ দেশের তরুণেরা নতুন করে চিনেছেন, তিনি হুমায়ূন আহমেদ। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, বরেণ্য পরিচালকসহ আরো অনেক পরিচয় নিয়ে পাঠক, দর্শক এবং শ্রোতাদের কাছে হুমায়ূনের তুলনা শুধু হুমায়ুন।
ছিলেন রসায়নের শিক্ষক। কিন্তু লেখালেখির নিজস্ব ঢং আর নির্মাণে বুঁদ করে রেখেছেন শত শত পাঠককে। তার তৈরি করা নানা চরিত্র পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা।
লেখক হুমায়ুন আহমেদ ২০১২ সালে মারা গেলেও তার তৈরি চরিত্রগুলো এখনো মানুষকে আকষর্ণ করে। সেসব চরিত্র ঘিরে নাটক ও চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে।
চলুন, এমন তিনটি চরিত্রের গল্প শুনে নেই আমরা।
রহস্য ভেদ করা মিসির আলী
মিসির আলী এমন একজন মানুষ, তিনি যে কাউকে দেখলেই তার সম্পর্কে বলে দিতে পারেন। তবে তিনি কথা বলেন কম। শোনেন বেশি। যে কোনো রহস্যর সমাধান অনায়াসে করতে পারেন তিনি। যে চরিত্রটি পেশায় একজন মনোবিজ্ঞানী।
তবে মিসির আলী পাঠকের কাছে এক রহস্যভেদী কিংবদন্তি। তার জীবনে প্রেম নেই। সংসার সেই। স্ত্রী নেই, কিন্তু রহস্যের ঘ্রাণ আছে। তিনি অলৌকিক বিষয়কে যুক্তি ও মনস্তত্ত্বের আলোয় ব্যাখ্যা করেন। ঠিক যেন হুমায়ূন আহমেদের আরেক চরিত্র হিমুর বিপরীত।
মিসির আলীকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন উপন্যাসে দেখা যায়, যখনই কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, মানুষ যায় মিসির আলীর কাছে। আর তিনি ঠান্ডা মাথায় সব রহস্য উন্মোচন করেন। অনেকটায় গোয়েন্দার মতো দক্ষতায়। তবে মিসির আলীর জীবন এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা ভরা।
তিনি যুক্তিতে বিশ্বাসী হলেও মাঝে মাঝে নিজের মনের গভীরে কিছু অলৌকিক শূন্যতা অনুভব করেন। যা তাকে কখনো কখনো গভীর খাদে ফেলে দেয়।
কয়েক বছর আগে মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। দেবী সিনেমায় করা তার অভিনয় দেখে মুগ্ধও হয়েছিলেন দর্শক। মিসির আলী চরিত্র নিয়ে তার ভাবনাটিও অন্যরকম।
''যখন আমার কাছে প্রস্তাবটি আসে তখন আমার একটা ভয় ও চিন্তা কাজ করছিল। কারণ চরিত্রটি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল আমার জন্য। তবে আমি হুমায়ূন আহমেদের নির্দেশনায় একটা ধারাবাহিক নাটকে কাজ করেছিলাম। তখন ওনাকে কাছ থেকে দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদই আসলে মিসির আলী,'' বলেন চঞ্চল চৌধুরী।
হিমু কেন এত জনপ্রিয়?
একজন বেকার যুবক। যার জীবনের কোনো লক্ষ্য মহাপুরুষ হওয়া। এজন্য সরল কিন্তু অদ্ভুত এক জীবন যাপন করেন তিনি। যে জীবনে কোনো চাপ বা চাহিদা নেই। টান থাকলেও আটকে থাকার ভয় নেই। নাম তার হিমু। বাবার দেওয়া নাম হিমালয়।
হুমায়ূন আহমেদ হিমুর সঙ্গে ভক্তদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন তার ময়ুরাক্ষী উপন্যাসে। এটি প্রকাশ পায় ১৯৯০ সালে। আর হিমুকে নিয়ে সবশেষ উপন্যাস 'হিমু ও হার্ভার্ড পিএইচডি বল্টু ভাই'।
মাঝে যত উপন্যাসে হিমুর বিচরণ ছিল সবখানেই তাকে ঘিরে রেখেছে মাজেদা খালা, বাদল (খালাতো ভাই), রহমতউল্লাহ তালুকদার। তাদের পাশাপাশি ছিল রূপা নামের চরিত্রটিও। যাকে হিমুর প্রেমিকাও বলা যায়।
পকেট ছাড়া হলুদ পাঞ্জাবি পরে হিমু। যেহেতু পকেট নাই তাই টাকা পয়সা নিয়েও তার খুব একটা চিন্তা করতে হয় না।
তবে টাকা পয়সার জন্য তার নিজের বা অন্য কারো কাজ কখনো আটকে থেকেছে এমনটা হয়নি। পায়ে জুতাও পরে না হিমু। খালি পায়ে শহর চষে বেড়ায়। রাতে ঘুমায় মেস বাড়িতে। যে মেস বাড়ির ম্যানেজার ভয়ংকর রাগী, কিন্তু হিমুর ভক্ত।
হিমুর বাবার ইচ্ছে ছিল হিমুকে মহাপুরুষ বানানো। হিমুর বাবা এ কারণে হিমুকে দিয়ে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়েছেন। ঢাকা শহরের পথে-পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো হিমুর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম।
বিভিন্ন উপন্যাসে চরিত্রটির নানারকম আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে। যদিও হিমু এটি কখনই স্বীকার করে না। কিন্তু সে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে আশপাশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে যায়।
হিমু চরিত্র নানা উপন্যাসে আসলেও হুমায়ূন আহমেদ পর্দায় তাকে আনেননি। তবে বিভিন্ন আয়োজনে হিমু সেজে অনেকেই হাজির হয়েছেন। কাউকে দেখে হুমায়ূন আহমেদ খুশিও হয়েছেন।
হিমু চরিত্রটি এত জনপ্রিয় হওয়ার বড়ো কারণ কী?
এ প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের অন্যতম প্রকাশক অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ''কিংবদন্তি কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র হিমু। যে কাজ করে এন্টি লজিক নিয়ে। আর মিসির আলী কাজ করে লজিক নিয়ে। অনেক সময় হুমায়ূন আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হতো, তিনি কোনো চরিত্রের মতো কিনা।''
' উত্তরে হুমায়ন আহমেদ বলতেন, লেখকের লেখা চরিত্রগুলোর মধ্যে লেখক বাস করেন। তাই আমার মনে হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে হিমু ও মিসির আলী দুজনই বাস করতেন। এ কারণেই চরিত্রগুলো জনপ্রিয়,'' বলেন মাজহারুল ইসলাম।
হিমু চরিত্র নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংখ্যা ২২-২৩ টি। মিসির আলী নিয়ে ১৭-১৮ টি। এমন তথ্য দেন মি. মাজহার।
রূপার প্রেমে পড়েননি তো?
হুমায়ূন আহমেদ কিংবা হিমুর ভক্ত কিন্তু রূপাকে চেনেন না এমন মানুষ নেই। রূপা নামটা উচ্চারণ করলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দরী এক তরুণীর ছবি। যার প্রেমে পড়েন যে কেউ। যার স্নিগ্ধতা, বুদ্ধিমত্তা ও সংবেদনশীল আকৃষ্ট করে সহজেই।
রূপার সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হিমুর। বিভিন্ন উপন্যাসে দুজনের প্রেমও দেখা যায়। তবে হুমায়ূন আহমেদের অনেক উপন্যাসে রূপা উপস্থিত থেকেও যেন এক রহস্যে মোড়া চরিত্র। সে কখনো হিমুর জীবনে আসে, কখনো দূরে সরে যায়। তবুও তার অস্তিত্ব থাকে গভীরভাবে।
অনেক জায়গায় বলা আছে, রূপা শুধু একটি প্রেমের চরিত্র নয়। সে বাংলা সাহিত্যে নারীর এক নতুন প্রতীক। যিনি চরিত্রটি সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পুরুষের চোখে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সে ভালোবাসে, আবার নিজের অবস্থানও বোঝে।
রূপার পছন্দ নীল শাড়ি। কপালে মাঝে মাঝে ছোট্ট টিপ আর চোখে কাজল পড়েন। সাধারণ সাজে অসাধারণ হয়ে ওঠেন রূপা। এ কারণেই অসংখ্য তরুণী নিজেকে রূপা সাজানোর জন্য নীল শাড়িকেই বেছে নেন।
বাবার জনপ্রিয় সব চরিত্র নিয়ে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেন তার ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। তিনি বলেন, ''বাবাকে আমি একবার তার চরিত্রগুলো নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। বাবা বলেছিলেন, বিদেশে যেমন : স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান বা সুপারম্যান আছে, আমার চরিত্রগুলিও সেরকম। আমার কাছে তুলনাটা খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছে।''
''তিনি বুঝিয়ে বলেছেন, আমাদের উইশ তো আসলে এটা না যে আকাশে উড়বো। কিন্তু আমরা তরুণ বয়সে এমনটা উইশ করি, রাস্তায় ঘুরবো। টাকার সমস্যা থাকলে সেটা মিটে যাবে। এটাও তো একটা সুপার পাওয়ার,'' বাবা লেখা হিমু চরিত্রটা নিয়ে এভাবে বলেন নুহাশ।
নুহাশ বলেন, ''বাবা আমাকে হিমু ও মিসির আলী চরিত্রটি নিয়ে এভাবে বুঝিয়েছেন, মিসির আলী হলো : একটা লজিক্যাল ক্যারেক্টার, কিন্তু সে ফেস করে সুপার ন্যাচারাল বা অতিপ্রাকৃত সব কিছু। হিমু হচ্ছে এটার উলটো। হিমুর মধ্যে অলমোস্ট সুপার ন্যাচারাল একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু লজিক নিয়ে কাজ করে বেড়ায়।''
বাবার সঙ্গে এসব চরিত্র নিয়ে প্রায়ই আলাপ হতো তার। এই প্রসঙ্গ তুলে নুহাশ বলেন, ''হিমু, মিসির আলী, রূপা শুভ্র চরিত্রগুলি ব্র্যান্ড হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার অনেক ছোটগল্প আছে যেগুলো মনে রাখার মতো। হুমায়ূন একনিষ্ঠ ফ্যানের সঙ্গে আলাপ হলে এগুলো নিয়ে কথা বলেন তারা।''
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
হুমায়ূনের উপন্যাস থেকে ঈদের ছবি
লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ নিজেই তার অনেকগুলো উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে গেছেন।
তবে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা বোঝা যায় এখনো তাকে নিয়ে চর্চা দেখলে।
তার মৃত্যুর বহু বছর পরেও এখনো তার লেখা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নাটক ও সিনেমা।
২০১৫ সালে হুমায়ুন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাস ঘিরে মোরশেদুল ইসলাম তৈরি করেছেন 'অনিল বাগচীর একদিন' সিনেমা।
২০১৬ সালে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন নির্মাণ করেন কৃষ্ণপক্ষ। ২০১৮ সালে মিসির আলী চরিত্র নিয়ে সরকারি অনুদানে অনম বিশ্বাস তৈরি করেন 'দেবী'।
হুমায়ুন আহমেদের গল্প ও উপন্যাস ঘিরে আরো অনেকেই চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম ও নাটক তৈরি করেছেন।
গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিছুক্ষণ থেকে নির্মিত সিনেমা বনলতা এক্সপ্রেস। সিনেমাটি টানা আড়াই মাস চলেছে প্রেক্ষাগৃহে।