আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পশ্চিমবঙ্গ অপেক্ষায় ফলাফলের, তবে আশাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলই
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
এখন অপেক্ষা ফলাফলের। যদিও অপেক্ষা করতে হবে চৌঠা মে পর্যন্ত, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের ফল নিয়ে 'আত্মবিশ্বাসী' প্রায় প্রতিটা রাজনৈতিক দল।
এর আগে উত্তাপ উপেক্ষা করে ম্যারাথন প্রচারপর্ব চলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিরা একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য-প্রচারণায় 'কড়া অস্ত্র' প্রয়োগ করেছে- কখনো জনসভা থেকে কখনওবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'ভার্চুয়াল ওয়ার' চলেছে। এরপর ভোট কেমন হবে,এ নিয়ে ছিল অনেক আলোচনা।
তবে রাজ্যে দু'দফা ভোট গ্রহণ শেষে 'যুদ্ধং দেহি' অবস্থান থেকে সরে এসে এখন সামান্য হলেও 'স্বস্তির নিঃশ্বাস' ফেলছেন নেতারা। এখন 'মার্কশিট' হাতে পাওয়ার অপেক্ষা, কে কত আসন পেল তা হাতে কলমে বুঝে নিতে যেটুকু দেরি।
এদিকে, প্রথম (৯৩.১৯ শতাংশ) ও দ্বিতীয় দফা (৯২.৬৭ শতাংশ) মিলিয়ে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণের সময় তাপমাত্রার দিক থেকে প্রকৃতি কিছুটা 'স্বস্তি' দিলেও সকাল থেকে নদীয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও হুগলী থেকে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনা এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়েছে।
বেলার দিক থেকে 'উত্তপ্ত' হয়ে উঠেছে কলকাতার ভবানীপুরও, যে বিধানসভা কেন্দ্রের দিকে শুরু থেকেই সকলের চোখ ছিল। কারণ সেখানে ভোটযুদ্ধে মুখোমুখি মমতা ব্যানার্জী ও শুভেন্দু অধিকারী।
কিন্তু তার পরের ছবিটা কেমন, কী বলছে রাজনৈতিক শিবিরগুলো-এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
প্রতিদ্বন্দ্বি দুই দলই আশাবাদী
ভোটের ফল চৌঠা মে প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও নিজেদের ফলাফল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী সব দলই। তৃণমূলের নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দমদম উত্তর কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়েছেন। জনসভা, র্যালি এবং সাংগঠনিক কাজের দায়িত্ব মিলিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততায় কেটেছে তার। তার কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার সকালে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমি কনফিডেন্ট (আত্মবিশ্বাসী)। আমরা জিতছি।"
একই আত্মবিশ্বাসের ঝলক মিলেছিল বুধবার কলকাতায় তৃণমূলের কার্যালয়েও। তৃণমূলের কুণাল ঘোষ বলেছেন, "প্রথম দফাতেই আমরা সেঞ্চুরি করে ফেলেছি। দ্বিতীয় দফার পর আমরা বলছি, বাংলায় বিজেপি ৫০ আসনও পার করতে পারবে না। আমি রাজ্যবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এই বিপুল পরিমাণে ভোট দেওয়ার জন্য।" বেলেঘাটা থেকে তৃণমূলের হয়ে নির্বাচনের ময়দানে নেমেছেন তিনি।
তার দাবি, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের সময় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নাম বাদ যাওয়া এবং বাংলা বললেই বাংলাদেশি 'তকমা' দেওয়ার মতো ইস্যুগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যবাসী নিজেদের রায় দিয়েছেন। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি।
এক্সিট পোল নিয়ে তার মত, "২০২১ সালের কথা মনে আছে? এখন কিছু এক্সিট পোল বিজেপিকে (আসন সংখ্যার নিরিখে) তিন অঙ্কের দেখানোর আবার কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এর সঙ্গে বাংলার গ্রাউন্ড রিয়েলিটির কোনো সম্পর্ক নেই। বিজেপি তিন অঙ্ক দূরের কথা, ৫০ পার করতে পারবে না। মমতা ব্যানার্জী ২৩৫ প্লাস আসন নিয়ে আবার ফিরে আসছেন।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
পশ্চিমবঙ্গে ফল নিয়ে সমান আত্মবিশ্বাসী বিজেপি নেতা তথা খড়্গপুর সদরের প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। তবে কোনো সংখ্যাতত্ত্বে যেতে চান না তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, "সংখ্যা বলাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সাফিসিয়েন্ট মেজরিটি নিয়ে সরকার গড়ব আমরা, পিছনে তাকাতে হবে না। বুক ফুলিয়ে সরকার চালাতে পারে এমন মেজরিটি পাবে বিজেপি।"
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যে প্রসঙ্গটা প্রথমেই তুললেন আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পাল, তা হলো ভোট দানের হার। "মানুষ বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন এবং আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। ভোট স্বচ্ছভাবে হয়েছে রিগিং হয়নি, তৃণমূল যাই বলুক।"
"ভোটের ফল আমাদের পক্ষে যাক বা বিপক্ষে আমি অন্তত বলতে পারব না যে সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়নি," বলেছেন তিনি।
তার কেন্দ্রে ২৩শে এপ্রিল ভোট হয়ে গিয়েছে। তারপর সাংগঠনিক কাজ থাকলেও অনেকটাই হাল্কা মেজাজে রয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল।
বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমি প্রচারের কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলাম। এবারে দু'বেলা মিলিয়ে ১২-১৫ কিলোমিটার হেঁটেছি। সব সেরে হয়তো দিনে তিন-চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। কোনো কোনো দিন তাও হয়নি। প্রথম দফা ভোটের পর ২৪শে এপ্রিল আমি যেখানেই বসছিলাম, নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। শরীর জুড়ে ক্লান্তি।"
ভোটের ফল নিয়ে আপাতত মোটেই 'টেনশন' করতে রাজি নন, সে কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে তৃণমূল-বিজেপির মতো প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান নিয়ে কম্পিটিশনে না নামলেও নিজেদের ফল নিয়ে 'আশাবাদী' কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট শিবিরও।
তিনদশক পর বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে মুর্শিদাবাদ আসন থেকে ভোটযুদ্ধে নেমে প্রথম থেকেই নিজের জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, "সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রবল ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ এই ভোটে আছড়ে পড়েছে।"
অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, "বাংলার মানুষের মেধা, উৎকর্ষতা এবং স্বাধীন চিন্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কোনো কারণ নেই। তারা বুদ্ধিমান। আমি মনে করি এসআইআর-এর আবহে তারা মিসলিড হবেন না। তারা যেভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যে পার্সেন্টেজে ভোট দিয়েছেন তাতে চৌঠা মে বোঝা যাবে যে চেনা হিসাবের সব গোলমাল হয়ে গিয়েছে।"
"আমি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলতে পারি যে সরকার তৈরি করার ক্ষেত্রে কারো আর আধিপত্য থাকবে না।"
পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বামফ্রন্টের প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত অবশ্য মনে করেন, তার দল সরকার গড়তে সক্ষম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, "যতদিন বিজেপির সরকার (কেন্দ্রে) আছে, ততদিন দেখবেন তৃণমূল নেতারা বাইরে আছেন। বামেদের সরকার হয়ে গেলে তৃণমূল-বিজেপির দুর্নীতিগ্রস্তদের জেলের ভিতরে দেখা যাবে।"
দুই দফার ভোট গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার সকালে গল্পের মেজাজেই ধরা দিলেন সিপিআই(এম)-এর নেতা সুজন চক্রবর্তী। ভোটের কথা বলতে গিয়ে কিছুটা নস্ট্যালজিকও হয়ে উঠলেন। তার কথায়, "আমাদের সময় আগে যখন ভোট হতো, ভোট একটা উৎসব ছিল। একটা-দু'টো আকস্মিক ঘটনা ছাড়া মানুষ শান্তিতে ভোট দিত। আমরা তখন স্কুল কলেজে পড়ি। এক একটা বুথের বাইরে ক্যাম্প হতো। বামফ্রন্টের ক্যাম্পে ২৫-৩০জন বসত আর কিছুটা দূরে কংগ্রেসের ক্যাম্পে ২৫-৩০ জন বসত। সারাদিন গল্প হতো।"
"কংগ্রেসের ক্যাম্পে একটু ভালো খাবার হতো, ওরা এসে দিয়ে যেত। আমরা চা-মুড়ি যা খেতাম সেটাও ওদের দিতাম। লোকে নিজের ভোট দেওয়ার পর সাইকেলে চেপে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ভোট দেখত। এত নিরাপত্তার দরকার হতো না। কিন্তু তৃণমূল আসার পর সেটা বদলেছে। এখন ভয় দেখিয়ে, ধমকে ভোট হয়।"
তার মতে চলতি বছরের বিধানসভা ভোটে বড়-সড় ঘটনা এড়ানো গেলেও এবারে 'উৎসাহ' ছিল না।
তার কথায়, "সেভাবে বড়সড় ঘটনা হয়নি ঠিকই, কিন্তু এবারে উৎসবের ভোট ছিল না। মানুষ এসআইআরের ভয়ে ভোট দিয়েছেন। এক্সিট পোল যাই বলুক। মানুষের রায় জানা যাবে চৌঠা মে।"
আইএসএফ-এর নওশাদ সিদ্দিকি ভাঙর থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। সহিংসতার অভিযোগে ভোটের সময় এই কেন্দ্র প্রায়শই শিরোনামে থাকে। "এবারে ভাঙরের মানুষ শান্তিতে ভোট দিয়েছেন। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই," বলেছেন মি. সিদ্দিকি।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
এখন প্রশ্ন হলো কোনো দলেই কি ভোটের ফল নিয়ে চিন্তা নেই?
প্রসঙ্গত, ভোটের দিন সকালে বুথে বুথে দেখা গিয়েছে মমতা ব্যানার্জীকে। সাধারণত তিনি গোটাদিন সামগ্রিক নির্বাচনের উপর চোখ রাখেন, বিকেলে মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভোট দিতে যান। কিন্তু দ্বিতীয় দফা ভোটের দিন তাকে কিছুটা হলেও অন্য মুডে দেখা গিয়েছে। যাকে 'অন্যভাবে' ব্যাখ্যা করেছে গেরুয়া শিবির।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "ঠেলায় পড়ে" বুথ প্রদর্শনে নেমেছেন মমতা ব্যানার্জী। শুভেন্দু অধিকারীর আরো দাবি "কোনো লাভ হবে না। বিপুল ভোটে হারবে।"
তবে ভোট দেওয়ার পরই 'বিজয়' চিহ্ন দেখিয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। তার দলের পক্ষ থেকে ২০০-র বেশি আসন পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, জয় সম্পর্কে নিশ্চিত শুভেন্দু অধকারীও জানিয়ে দিয়েছেন তার দল জিতছে।
সংবাদমাধ্যমে এই নিয়ে প্রতিবেদনও হয়েছে। পাশাপাশি এক্সিট পোল নিয়ে প্রতিবেদনগুলো বলছে কে কত আসন পাবে তা এখনই আন্দাজ করা মুশকিল হলেও তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই যে হবে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।
'কে জিতবে কে জানে?'
বিধানসভা ভোটের ফল নিয়ে যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মহল এবং বিশ্লেষকদেরই মধ্যেই আলোচনা হচ্ছে তা নয়, পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বাড়ির ড্রইং রুম সব বিষয়কে টেক্কা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কী হবে চৌঠা মে।
গড়িয়ার বোড়ালের বাসিন্দা মিত্রায়ু দাশগুপ্তর কথায়, "ছেলেবেলায় বামেদের দেখেছি, স্কুল-কলেজ লাইফে তৃণমূলকে দেখলাম। কেন্দ্রে বিজেপিকে দেখছি। আমাদের কাছে বেছে নেওয়ার অপশন খুব কম। কী হবে দেখা যাক।"
দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসিন্দা কৃষ্ণ জয়সওয়ালের বয়স কুড়ির কোঠায়। তিনি বলেছেন, "মানুষ এবার ভোট দিয়েছে- তা সে খুশিতে দিক বা ভয়ে। তাছাড়া এখনো পর্যন্ত সেভাবে ভায়োলেন্স যে হয়নি সেটাও বড় কথা। কিন্তু এবারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কে জিতবে কে জানে?"