আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা যেভাবে জড়ালেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে, অপেক্ষা এখন ভোটের ফলাফলের।
এই প্রতিবেদনও বিধানসভার ভোট নিয়েই, তবে এই কাহিনির শুরু প্রায় দুই দশক আগে।
ভোটের খবরাখবর নিতে সেবার গিয়েছিলাম এক বাংলাদেশি ভূখণ্ডে।
উত্তরাঞ্চলীয় কোচবিহার জেলার একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম সেবার, সঙ্গী ছিলেন কোচবিহারের এক সিনিয়র সাংবাদিক।
চাষের খেতের মাঝ বরাবর আলপথ দিয়ে যেতে যেতে তিনি হঠাৎই বললেন, "এই ছিলে ভারতে, আর এই তোমার পা পড়ল বাংলাদেশি ভূখণ্ডে।"
কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীদের কড়া নজরদারিও ছিল না, তবুও পেরিয়ে চলে গেলাম এক দেশ থেকে অন্য দেশে।
গ্রামটার নাম পোয়াতুরকুঠি। ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের মধ্যে সব থেকে বড়ো গ্রাম ছিল এটি।
ঠিক দুই দশক পরে আবারও ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ফিরে গিয়েছিলাম ওই গ্রামটিতে।
এবার আর পায়ে হেঁটে নয়
সেদিনের সেই সিনিয়র সাংবাদিকের বদলে এবারে সঙ্গী ছিলেন গ্রামের যুবক রহমান আলি, চেপে বসেছিলাম মি. আলির মোটরসাইকেলে।
বছর ২০ আগের মতোই তিনি দেখালেন, "এই ছিল বাংলাদেশের সীমানা, আর এরপর থেকে ছিল ভারত।"
দুই দশক আগের সেই সীমানা চিনিয়ে দেওয়ার ধরনের মধ্যে ফারাকটা কানে বিঁধল, আগে শুনেছিলাম 'বর্তমান' কালের কথা, এখন সেটা 'অতীত'।
এই 'অতীত' আর 'বর্তমান' এর ফারাকটা হয়েছে ২০১৫ সালের ৩১শে জুলাই আর পয়লা অগাস্টের মধ্যরাতে। ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে আগেই স্বাক্ষরিত স্থল-সীমা চুক্তি অনুযায়ী ওই রাতে ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১ টি ছিটমহল বিনিময় করে দুই দেশ, ছিটমহলগুলি মিশিয়ে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের সঙ্গে।
তাই, এত বছর পরে অতীতের সেই আলপথ দিয়ে নয়, এবার বর্তমানের পাকা রাস্তা দিয়েই পৌঁছে গিয়েছিলাম পোয়াতুরকুঠিতে 'বড়ো রহমান আলির' বাড়ির উঠোনে। এর আগে যার মোটরসাইকেলে চেপেছিলাম, তিনি হলেন 'ছোট রহমান আলি'।
এরকমই একটা উঠোনে আমার সঙ্গে সেবার কথা বলার জন্য হাজির হয়েছিলেন অনেক মানুষ। মনসুর আলি, রহমান আলি, সাহেব আলি … আরও কত নারী-পুরুষ।
সেদিনই নিজের কানে শুনেছিলাম, স্বচক্ষে দেখেছিলাম যে নাগরিকত্বহীন হয়ে, কোনোরকম নাগরিক সুযোগ সুবিধা ছাড়াই কীভাবে বেঁচে ছিলেন এই মানুষগুলো – দশকের পর দশক ধরে।
তারা ছিলেন বাংলাদেশি ভূখণ্ডের বাসিন্দা, সেই অর্থে বাংলাদেশের নাগরিক।
বাড়ির ওপর দিয়ে ভারতীয় গ্রাম থেকে ভারতেরই অন্য দিকে গেছে বিদ্যুতের লাইন, তবে তাদের ঘরে ঢুকত না সেই বিদ্যুৎ। ছিল না স্কুল, কলেজ – ছাত্রছাত্রীদের নাম, পরিচয় ভাঁড়িয়ে পড়তে যেতে হতো ভারতের স্কুল কলেজে। চিকিৎসার জন্যও যেতে হত ভারতের হাসপাতালে, অনেক সময়েই ফিরিয়ে দেওয়া হত, তারা 'ছিটের বাসিন্দা' – এই যুক্তিতে।
তবে ভারতীয় হাসপাতাল থেকে 'ফিরিয়ে দেওয়ার' সেই ট্র্যাডিশন বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ছিটমহলেরই এক দম্পতি – জিহাদ হোসেইন ওবামার পিতা-মাতা আসমা বিবি আর তার স্বামী শাহজাহান শেখ।
তার কথায় আসব একটু পরে।
ছিটমহলের বাসিন্দাদের আরও ছিল না ভোট দেওয়ার অধিকার।
'ভারতীয়রা যে ভোট দিতে পারবেন না?'
বিবিসি বাংলা যখন পোয়াতুরকুঠি, মশালডাঙ্গার মতো বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোতে ঘুরছে, মানুষের নাগরিকত্বহীন হয়ে বেঁচে থাকার কাহিনি শুনছে, তার কিছুদিন পরেই ছিল ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন।
ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি দেখতে সেই সময়ে কোচবিহারে হাজির হয়েছিলেন ভারতের নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন উপ-প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
সরকারি বৈঠক সেরে বেরোনোর সময়ে কোচবিহার শহরের সার্কিট হাউসের সামনে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, "অনেক ভারতীয় নাগরিক তো এবার নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। তাদের ব্যাপারে কমিশন কী ভাবছে?"
ততদিনে আমি যেমন ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ছিটমহলের মানুষের কথা শুনেছি, তেমনই জেনে গেছি বাংলাদেশের ভেতরেও আছে অনেক ভারতীয় ভূখণ্ড। সেখানকার নাগরিকদের ভারতের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা নেই।
প্রশ্নটা শুনে একটু ঘাবড়িয়েই গিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা। একটু ব্যাখ্যা করে বলেছিলাম, "বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল আছে, তারা তো খাতায় কলমে ভারতের নাগরিক। এই ভারতীয়রা যে ভোট দিতে পারবেন না? তাদের ভোট নেওয়ার কী ব্যবস্থা করছেন?"
তিনি জবাব এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলতে।
গিয়েছিলাম তৎকালীন জেলাশাসকের কাছেও।
প্রশ্ন শুনেই তার জবাব ছিল, "ভোটের আগে কি এটা একটা আলোচনা করার মতো ইস্যু?"
কিছুক্ষণ তর্কও হয়েছিল, মনে আছে।
তবে, ওই যে, বছরের পর বছর যে প্রান্তিক মানুষগুলোকে নিয়ে কোনো সরকারেরই মাথাব্যথা ছিল না, তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে যেন কারোই কোনো দায় ছিল না – সেটা আবারও সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম।
বছর ২০ পরে এই কদিন আগে যখন আবারও ফিরে গিয়েছিলাম পোয়াতুরকুঠিতে, দেখা করলাম মনসুর আলির সঙ্গে। কয়েক বছর আগে সেরিব্রাল স্ট্রোকের পর থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছেন। বহুদিন পরে আমাকে দেখে অল্পস্বল্প চিনতে পেরে কান্নাকাটি করছিলেন।
যেদিন ছিটমহল বিনিময় হচ্ছিল ২০১৫ সালের ৩১শে অগাস্ট মাঝরাতে, সেদিন এই মানুষটার বলা একটা কথা এখনও কানে লেগে আছে : "আমার এই ৭৬ বছর বয়সে চারটে দেশের বাসিন্দা হয়ে থেকেছি – প্রথমে ব্রিটিশ ভারত, তারপর পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৭১ এর পর থেকে বাংলাদেশ। এখন ভারতীয় হলাম।"
ভারতের নির্বাচন কমিশন গত কয়েক বারের মতোই এই ২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও বৃদ্ধ, চলশক্তিহীন ভোটারদের বাড়ি গিয়ে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
আমি যেদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, সেদিনই মনসুর আলির বাড়িতে এসে কর্মকর্তারা তার ভোট নিয়ে গেছেন।
কিন্তু ওসমান গনির এবারে ভোট দেওয়া হল না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় গ্রাম ছোটো গারোলঝোরা থেকে ছিটমহল বিনিময়ের সময়ে স্বেচ্ছায় ভারতে চলে এসেছিলেন ওসমান গনি। এখন থাকেন মধ্য মশালডাঙ্গায়। ভারতে ভোটও দিয়েছেন আগে।
২০২৬ সালের ভোটের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় তার এবং পরিবারের আরও দুজন সদস্যের নাম বাদ পড়েছে। তাই এবার তাদের ভোট দেওয়া হল না আর।
ছিটমহলের 'বাংলাদেশি'রাও ভোট দিতেন ভারতে
সাবেক ছিটমহলগুলির মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ভোটে অংশ নিতে শুরু করেন ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে।
তবে একবার তারা বাংলাদেশের একটি নির্বাচনেও ভোট দিয়েছিলেন। সেটা ছিল প্রতিবেশী দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
সাবেক ছিটমহলগুলির প্রবীণ বাসিন্দারা আমাকে বলেছিলেন যে ১৯৭৮ -৭৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সেদেশ থেকে ভারতের মধ্যে দিয়ে ছিটমহলে ভোট করাতে এসেছিলেন কর্মকর্তারা। একজন সম্ভবত সেই ভোটের প্রার্থীও হয়েছিলেন, যে কারণে অনেক দশক পরেও তিনি পরিচিত ছিলেন 'মেম্বার আলি' নামে।
বাংলাদেশি ছিটমহলের ভোট নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ল, সেই ২০০৬ সালে প্রথমবার ছিটমহলে যাওয়ার পরে কোনো একটা নির্বাচনের সময়ে ছিটমহলে গিয়ে শুনতে পেলাম যে অনেকেই নাকি সেবার ভারতের ভোটার হয়েছেন। অনেকের কাছেই দেখতে পেয়েছিলাম সেই ভোটার কার্ড। বিষয়টা নিয়ে খোঁজখবর করতেই জানা গিয়েছিল সত্যটা।
তারা বলছিলেন, "ছিটের বাইরে গেলেই পুলিশ আর বিএসএফ হেনস্তা করত। তাই বাধ্য হয়েই বাপ-মায়ের পরিচয় লুকিয়ে অবৈধ ভাবে ভারতের ভোটার কার্ড বানিয়েছিলাম। ভোটও দিয়েছি একবার। হাজার দশেক টাকা লেগেছিল কার্ড বার করতে। তবে এখন বৈধ ভোটার কার্ড পেয়ে গেছি সবাই।"
এবারে, ২০২৬ সালে ভোটের আগেও কথায় কথায় কয়েকজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে সেই পুরোনো ভোটার কার্ডগুলো আছে কিনা।
একজন তো সঙ্গে সঙ্গেই বার করে দেখালেন পুরোনো সেই কার্ড – স্মৃতি হিসাবে রেখে দিয়েছেন যত্ন করে।
জিহাদ হোসেইন ওবামা
নাম-পরিচয় ভাঁড়িয়ে যে শুধু ভোটার কার্ড করিয়েছিলেন সাবেক ছিটমহলগুলির বাসিন্দারা, তা নয়।
জীবনযাপনের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই পরিচয় ভাঁড়িয়ে ভারতীয় কোনো আত্মীয়ের পরিচয় ব্যবহার করতে হত তাদের – না হলে যে চিকিৎসা থেকে শুরু করে শিক্ষা – কোনো পরিসেবাই পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না তারা।
তবে এই ট্র্যাডিশনে ছেদ টানে একটি শিশুর জন্ম।
সেই জিহাদ হোসেইন ওবামার কথাই লিখেছিলাম একটু আগে।
জিহাদ হোসেইন ওবামা কেউকেটা কেউ নন। এখন ১৬ বছরের কিশোর। মধ্য মশালডাঙ্গা সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা এই কিশোরের সঙ্গে এবার ভোটের আগে গিয়ে দেখা হয়নি। বাবার সঙ্গে কাজে গেছে মুর্শিদাবাদে।
এই জিহাদের জন্ম কাহিনি খুবই চিত্তাকর্ষক।
জিহাদ-ই প্রথম ছিটমহলের সন্তান, যে নিজের বাবা-মায়ের আসল পরিচয়েই জন্মিয়েছে ভারতের হাসপাতালে।
তার এই নামকরণের পিছনে একটি কাহিনি আছে, লড়াইয়ের কাহিনি – ভারতের সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এক ছিটমহলবাসী দম্পতির অসম লড়াইয়ের ঘটনা। এই লড়াইটা শুরু হয়েছিল যখন জিহাদের মা আসমা বিবি-র প্রসব বেদনা উঠেছিল ২০১০ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি।
আসমা বিবি আর তার স্বামী শাহজাহান শেখ চেয়েছিলেন তাদের সন্তান আসল বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়েই জন্মাক, কিন্তু বাধ সেধেছিল ভারতের দিনহাটা হাসপাতাল।
তবে এক সময়ে ছিটমহলবাসীদের সম্মিলিত চাপের কাছে মাথা নোয়াতে হয় ওই হাসপাতালকে। নিজের নাম আর ছিটমহলের ঠিকানা দিয়েই আসমা ভর্তি হন আর জন্ম হয় জিহাদের।
ঘটনাচক্রে আসমা বিবি-র নামও বাদ গেছে এসআইআর প্রক্রিয়ায়। আর জিহাদের তো এখনও ভোট দেওয়ার বয়সই হয় নি।
রহমান আলির মোটরসাইকেলে
অতীত থেকে ফিরে আসি বর্তমানে।
গ্রামগুলি এই ১১ বছরে অনেক বদলে গেছে। ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুৎ, গ্রামে পাকা রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি হল – অনেক কিছুই চোখে পড়ছিল।
পোয়াতুরকুঠির রহমান আলি নিয়ে গেলেন সেই পুকুরপাড়ে, যেখানে ২০১৫ সালের পয়লা অগাস্ট সকালে কোচবিহারের জেলা শাসক ভারতের পতাকা তুলে আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহল এলাকাগুলিকে ভারতীয় ভূখণ্ডের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
তার কয়েক ঘণ্টা আগে, ৩১শে জুলাই আর পয়লা অগাস্টের মধ্যরাতে আরেকটি ছিটমহল – মধ্য মশালডাঙ্গায় উদ্যাপিত হয়েছিল মানুষের উৎসব – নতুন স্বাধীনতার আস্বাদ গ্রহণের উৎসব।
দুটি অনুষ্ঠানেই হাজির থাকতে হয়েছিল পেশাগত কারণেই। রহমান আলির সঙ্গে সেই মাঠ যেমন দেখে এলাম, তেমনই দেখে এসেছিলাম মধ্য মশালডাঙ্গার মাঝ রাতের অনুষ্ঠানস্থলটিও – যেখানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ লড়াই জেতার আনন্দে মেতেছিলেন রহমান আলি, জয়নাল আবেদিন, সাদ্দাম হোসেনরা, আরও কত হাজার নারী-পুরুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিটমহল বিনিময়ের দাবিতে লড়াই করেছিলেন।
তবে এখন আর সবাই 'কাঁধে কাঁধ' মিলিয়ে নেই। গড়ে উঠেছে একটা অদৃশ্য দেওয়াল। ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরে সেই দেওয়ালটা তুলে দিয়েছে রাজনীতি।
কেউ গেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে, কেউ বিজেপির দিকে আকৃষ্ট, হাতে গোনা কয়েকজন বামপন্থী।
মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে রহমান আলি বলছিলেন, "ছিটমহল বিনিময়ের সময়ে যত আশা ছিল, গত ১১ বছরে তার তিনভাগের এক ভাগও আমরা পাই নি। যদি জোটবদ্ধ থাকতাম আগের মতো, তাহলে হয়ত দাবি আদায় করা সহজ হতো।''
সাবেক ছিটমহলগুলির বাসিন্দাদের অভিযোগ জমি চিহ্নিতকরণ করে খতিয়ান তারা হাতে পেয়েছেন, তবে জমির দলিল এখনও পাওয়া যায়নি। পোয়াতুরকুঠিতে দুটো স্কুল হওয়ার কথা ছিল, একটা হয়েছে, অন্যটা এখনও গড়ে ওঠেনি। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে, তবে অন্য আরেকটির ঘর তৈরি হয়ে গেলেও সেখানে এখনও কাজ শুরু হয় নি।
ওই গ্রামেরই মর্জিনা বিবির কথায়, "আমার ঠাকুরপো তো এত আন্দোলন করল, বাংলাদেশে গেছে, কলকাতা, দিল্লি কোথায় না গেছে আন্দোলনের কাজে। কিন্তু কিছুই তো পেল না। ছেলেপিলের চাকরি নেই। পাওয়ার মধ্যে আছে শুধু ঢালাই রাস্তা, বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস, রেশন কার্ড।"
"আমরা রাজনীতির জাঁতাকলে পড়ে গেলাম," বলছিলেন পোয়াতুরকুঠিরই জায়দুল শেখ।
তিনি আরও বলছিলেন, "ছিট বিনিময়ের পরে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমরা সবাই একসঙ্গেই ছিলাম, যাতে আমাদের হক আদায় করে নিতে পারি। কিন্তু দলীয় রাজনীতি তো আমাদের মধ্যে ভাগাভাগি গড়ে দিল।"
আবার মশালডাঙ্গার যুবক আলমগীর হোসেন বলছিলেন, "যে-সব সুবিধা পাওয়া গেছে, সেসব তো সরকারি দল বা বিরোধী দল – দুই পক্ষের সমর্থকরাই পাচ্ছে। যারা সরকারি দলের সঙ্গে হেঁটেছে, তারাও তো আমাদের মতোই জমির দলিল পায়নি। তাহলে লাভটা কী হল?"
পাশে দাঁড়িয়ে সাদ্দাম হোসেনের আক্ষেপ, "আমরা যখন ছিটমহল বিনিময়ের জন্য লড়েছি, তখন তো নিজের বা পরিবারের জন্য আন্দোলন করিনি। সবার জন্যই লড়েছিলাম। কিন্তু কারো হয়ত ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাই কোনো একটা দলের পক্ষে চলে গেছে।"
কীভাবে জড়ালেন রাজনীতিতে?
সাবেক ছিটমহলগুলির বাসিন্দারা বলছিলেন যে তাদের কারো ওপরে স্থানীয় রাজনৈতিক দল বা নেতাদের চাপ ছিল তাদের দলে যোগ দেওয়ানোর জন্য।
কেউ বলছিলেন ব্যক্তি স্বার্থের কথা। আবার তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি – দুই পক্ষেরই যে সাবেক ছিটমহলগুলির নতুন ভারতীয় হয়ে ওঠা ভোটারদের প্রয়োজন ছিল, সেটাও বলছিলেন কয়েকজন।
আর রাজনীতির এই ভাগাভাগিতে কেউ এখন এক সময়ের সহ-আন্দোলনকারীদের মুখ দেখেন না, কথা বলেন না।
পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দা, স্থানীয় পঞ্চায়েতের তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত সদস্য মহিরুদ্দিন আলির কথায়, "রাজনৈতিক দল তো ভাগ করতে চাইবেই। সেটাই হয়েছে। তবে জানেন, আমাদের নেতা যিনি ছিলেন, যার কথায় আমরা উঠতাম-বসতাম, সেই তিনি যখন একটি দলে যোগ দিলেন, একজন মুসলমান হিসাবে তাকে সমর্থন করা বা তার সঙ্গে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
"নেতাকে এখনও ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু মতবিরোধটা রাজনৈতিক," বলছিলেন মি. আলি।
যে নেতার কথা বললেন মি. আলি, তিনি হলেন ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির প্রধান দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। ছিটমহল বিনিময়ের দাবিটা প্রথম তুলেছিলেন মি. সেনগুপ্তর বাবা, বামপন্থী ফরোয়ার্ড ব্লকের বিধায়ক দীপক সেনগুপ্ত এবং তার আরও কয়েকজন বামপন্থী সহকর্মী।
ছিটমহল বিনিময়ের বেশ কয়েক বছর পরে দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বিজেপি দলে যোগ দিয়েছিলেন। এখন অবশ্য তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি আর করেন না।
তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, "আপনি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরেই কি ছিটমহলে দলীয় রাজনীতি ঢুকে ভাগাভাগিটা গড়ে দিল?"
তার জবাব ছিল, "আমি যখন একটি দলে যোগ দিয়েছিলাম, কাউকে কিন্তু বলি নি আমার সঙ্গে সেই দলে যোগ দিতে। এটা ঠিকই, রাজনীতির কারণেই সাবেক ছিটমহলগুলির মধ্যে ভাগাভাগি তৈরি হয়েছে। তবে এখন মনে হয় যে এখানকার মানুষের বোঝার দরকার ছিল যে দলীয় রাজনীতি কীভাবে একসময়ের আন্দোলনের সহকর্মীদের মধ্যে বিভাজন গড়ে তুলতে পারে। এখন হয়ত তারা সেটা কিছুটা বুঝতে পারছে যে একজোট হয়ে না থাকলে নিজেদের দাবিগুলো আদায় করা যায় না।"
মশালডাঙ্গার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলছিলেন, "ভিন্ন রাজনীতি যখন করতাম, রাজনৈতিক মনোমালিন্য হয়েছে, আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব কিন্তু অটুট থেকেছে সবসময়ে। কথাও বন্ধ হয় নি," বলছিলেন জয়নাল আবেদিন।