আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হাম পরীক্ষায় কিট 'স্বল্পতা', সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
প্রায় দুই মাস ধরে বাংলাদেশে শিশুদের হাম সংক্রমণের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। এরইমধ্যে, হাম শনাক্তে পর্যাপ্ত কিট নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত হাম এবং এর উপসর্গে ৩২৪টি শিশু মারা গেছে। হাম বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু দেশে হাম শনাক্ত করার পরীক্ষা করা হয় শুধু রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে। দেশের অন্য কোথাও আর এই পরীক্ষা করার সুযোগ নেই।
আর হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই সেই পরীক্ষাগারে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কিট নেই বলে খবর এসেছে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে।
তবে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমানের দাবি, এই পরিস্থিতিকে 'সংকট' বলা যাবে না, এটাকে 'স্বল্পতা' বলে উল্লেখ করেন মি. রহমান।
"স্যাম্পলের তুলনায় একটু কিটের সংখ্যা কম। সংকট বললে এটা অন্য বিষয় হয়ে যায়। আমাদের হাতে এখনো এভেইলেবল কিট আছে," বলেন মি. রহমান।
তবে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার পরিস্থিতি অনুধাবন করলেও প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই আইসিইউ সংকট ও টিকার ঘাটতির অভিযোগ সামনে আসে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি বা পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি ঘোষণা করা দরকার। আমাদের একনলেজ করা দরকার। যদি তা না করি বা বিদেশ থেকে যে কিট আসবে তারা কিন্তু নরমাল শিডিউল করে আনবে। জরুরিভাবে দেবে না।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
কিটের অভাব কতখানি?
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, হাম শনাক্ত করার জন্য প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ স্যাম্পল পায় এই ইনস্টিটিউট।
একটি কিটে ৯০টি রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার এই ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে ১৩টি হাম শনাক্তকরণ কিট রয়েছে।
আর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এখন দিনে একশোর বেশি পরীক্ষা করছে না।
জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা ডেইলি একশ-দুইশ পরীক্ষা করছি। এই ১৩টি কিটে প্রায় বারোশোর মতো নমুনা পরীক্ষা করা যাবে।"
অর্থাৎ এখন যে ১৩টি কিট রয়েছে সেগুলো দিয়ে মাত্র চারদিন চলবে কি না জানতে চাইলে মি. রহমান দাবি করেন, চারদিন বলা যাবে না, "আমরা প্রতিদিনই টেস্ট করছি"।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাম পরীক্ষা করার কিটটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে পায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ প্রথম গত আটই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে হাম শনাক্ত করার কিট চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। এরপরে আরো একবার কিটের অর্ডার দিয়েছিল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ কিটের অর্ডার দিলে সেই চাহিদার ভিত্তিতে ডব্লিউএইচও ফ্যাক্টরিতে কিট তৈরির নির্দেশ দেয় বলে জানান মি. রহমান।
ফলে কিটের ঘাটতি হবে না দাবি করে মি. রহমান বলেন, "আজ ওরা ইনডিয়া থেকে শিপমেন্ট করবে বললো। কাল-পরশুর মধ্যে ৩০টি পাবো। আগামী সপ্তাহে আরো ১০০টা আসবে।"
দেশে হাম শনাক্তকরণের একমাত্র এই সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত কিট চেয়ে ফেব্রুয়ারিতে চাহিদা দেওয়া হলে সেসময় ৭০টি কিট বাংলাদেশকে দিয়েছিল ডব্লিউএইচও।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান জানান, "আমাদের কাছে ছিলই। তখন ৫৭টি ছিল। আরো একশটা দেওয়ার জন্য ওদের চিঠি দিছি। ওই চিঠির প্রেক্ষিতে ওরা ৭০টা আমাদের সাপ্লাই দেয়। ওইটা দিয়ে পরীক্ষা করি, কিন্তু আমাদের স্যাম্পল তো অনেক আসে।"
"কিটের সংকট নেই, স্বল্পতা রয়েছে" উল্লেখ করে এর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে মি. রহমানের দাবি, "এগুলো এভেইলেবল থাকে না। এগুলো প্রি-অর্ডার সাপ্লাই। অর্ডার দিলে ওরা তৈরি করে তারপর সাপ্লাই দেয়, যে কারণে একটু টাইম লাগে আরকি।"
'পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি ঘোষণা করতে হবে'
বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও।
আন্তর্জাতিক এই সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' বলেও সংস্থাটি মূল্যায়ন করেছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই নিউমোনিয়াসহ শারীরিক অন্যান্য জটিলতা, আইসিইউ সংকট, টিকার ঘাটতি নানা ইস্যু সামনে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হামসহ অন্যান্য টিকা নিজেরা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংকট দেখা দেয়। যেটি এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকট হয়ে ওঠে।
কিন্তু এরপর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
যদিও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক আহমদ বলছেন, কিট সংকট নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু হাম নিয়ে জরুরি অবস্থাটা বোঝা দরকার।
"পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি ডিক্লেয়ার করলেই কেবল জরুরিভাবে কিট বা কোনোকিছু দেশে আনতে চাইলে সেটির আইনি ভিত্তি থাকবে। এটা হলেই কেবল দেশে ও বিদেশে সব জায়গায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা যাবে, এটি আইনের দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে," বলেন মি. হোসেন।
মি. হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকার হামকে পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সির আওতায় এনে ঘোষণা না দিলে, "অফিসিয়াল রিকগনিশন না থাকলে চাইলেও জরুরি ভিত্তিতে কিট আনা যাবে না"।
একইসঙ্গে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিও বিবেচনার যোগ্য।
বিদ্যমান পরিস্থিতি "সরকার অনুধাবন করলেও জরুরি পরিস্থিতির স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে সব বিষয়ে উচ্চতর মহল থেকে মৌখিকভাবে টেলিফোন করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় হচ্ছে না" বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই জনস্বাস্থ্যবিদ।
সংক্রমণের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুধবার যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে মারা গেছে দুই শিশু এবং উপসর্গজনিত রোগে আরো পাঁচ শিশু মারা গেছে।
১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মারা গেছে ৫৬ শিশু এবং উপসর্গজনিত রোগে ২৬৮ শিশু।
এই সময়ে দেশে ছয় হাজার ৯৯ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।
একইসঙ্গে ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ৮৮৫ জন।
রাজশাহী বিভাগে প্রথমে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকা বিভাগেই হামে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেশি।
দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত হামে মারা গেছে ৩৭টি শিশু। চট্টগ্রাম বিভাগে সাতজন এবং বরিশাল বিভাগে পাঁচ শিশু মারা গেছে।
রাজশাহী বিভাগে এখন পর্যন্ত দুই শিশু হামে মারা গেছে, আর হামের উপসর্গে মারা গেছে ৭৬টি শিশু।