এখনো 'আসল' ব্রাজিল দেখার অপেক্ষায় বিশ্বকাপ

সবুজ মাঠে গাঢ় নীল জার্সি পরা ব্রাজিল দলের তিনজন ফুটবলার

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রাজিলের সেরাটা এখনো দেখার আক্ষেপ আছে দর্শকদের
    • Author, সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
    • Role, অতিথি লেখক
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুটা আশানুরূপ করতে পারেনি।

প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ব্রাজিল। দ্বিতীয় ম্যাচে জয় তুলে নেয় দলটি।

বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে গ্রুপ সির ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় ব্রাজিলকে শুধু তিনটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর দলটির প্রকৃত সামর্থ্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে।

তবে, কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এই ম্যাচে এমন এক রূপ দেখিয়েছে, যা সমর্থকদের আশাবাদী করে তুললেও একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও সামনে এনেছে।

ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের জন্য আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ম্যাথিউস কুনহা ও ভিনিসিয়াস জুনিয়র। কুনহা দলে সুযোগ পেয়ে দুই গোল করেন। আর আগের ম্যাচের গোলদাতা ভিনিসিয়াস আরো একটি গোল করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তবে র‍্যাংকিং এ ৮০ ধাপ পিছনে থাকা (ব্রাজিল ৫ ও হাইতি ৮৫) দলের বিপক্ষে এই জয়টি সমর্থকদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেনি। এখনো ব্রাজিলের খেলা, দলীয় সংহতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে এবং এই দল কতদূর যেতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ ছিল অনেকটাই বিচ্ছিন্ন, মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব ছিল স্পষ্ট, আর প্রতিপক্ষের ঘন রক্ষণ ভাঙতে গিয়ে তারা বারবার সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু হাইতির বিপক্ষে মাঠে নেমে অনেকটাই ভিন্ন এক ব্রাজিলকে দেখা গেল।

শুরু থেকেই দলটি আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে খেলতে থাকে। উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণ, বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনের পেছনে রান এই সব মিলিয়ে ব্রাজিলের খেলায় ছিল অনেক বেশি গতি ও সংহতি।

সবুজ মাঠে ব্রাজিলের নীল জার্সি পরা একজন ফুটবলার এবং হলুদ জার্সিতে হাইতির গোলকিপার। দূরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাইতির বিরুদ্ধে জয় পেলেও ব্রাজিলের প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ম্যাচের প্রথমার্ধেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। খেলার ২৩তম মিনিটে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের একটি নিচু শট হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিড প্রাথমিকভাবে রুখে দেন। তবে ফিরতি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে হাইতির ডিফেন্ডার হানেস ডেলক্রোইক্সের গায়ে লেগে বলটি কুনহার কাছে চলে আসে এবং তা জালে জড়িয়ে যায়, যার ফলে ব্রাজিল ১-০ গোলে এগিয়ে যায়।

এর ১৩ মিনিট পর মিডফিল্ডে বল দখলে নিয়ে লুকাস পাকেতা পাস দেন ভিনিসিয়াসকে। ভিনিসিয়াসের নিখুঁত থ্রু বল ধরে দারুণ ক্ষিপ্রতায় ডি-বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল সরাসরি টপ কর্নারে পাঠান কুনহা। এই গোলের মাধ্যমে ব্রাজিল ২-০ ব্যবধানের লিড নেয়।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে লুকাস পাকেতার একটি চমৎকার লং পাস ধরে হাইতির ডিফেন্স ভেঙে বল নিয়ন্ত্রণে নেন রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়াস জুনিয়র। এরপর ঠান্ডা মাথায় দারুণ ফিনিশিংয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে স্কোরলাইন ৩-০ করেন তিনি।

তিনটি গোলই ছিল ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক দর্শনের প্রতিফলন। দ্রুত বল আদান-প্রদান, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে স্থানচ্যুত করা এবং উইং থেকে ভেতরে ঢুকে আক্রমণ তৈরি করার যে পরিকল্পনা আনচেলত্তি গ্রহণ করেছিলেন, তা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়।

ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে ব্রাজিল মূলত ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলেছে। রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ গড়ার সময় ফুলব্যাকরা অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছিলেন, ফলে মাঠের প্রস্থ বাড়ছিল। মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আক্রমণভাগে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করছিলেন।

ভিনিসিয়ুস বাম প্রান্ত থেকে বারবার ভেতরে ঢুকে হাইতির ডিফেন্সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন, আর কুনহা সেই সৃষ্ট ফাঁকগুলো কাজে লাগিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করছিলেন। বল হারানোর পর ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক প্রেসিংও ছিল উল্লেখযোগ্য। এর ফলে হাইতি খুব কম সময়ই সংগঠিত আক্রমণ গড়ে তুলতে পেরেছে।

ব্রাজিল ও হাইতির দুইজন ফুটবলার বলের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপ জিততে শুধু প্রতিভা নয়; বরং ধারাবাহিকতা ও মানসিক দৃঢ়তাও দরকার

এই ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা।

ভিনিসিয়াস আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। তার গতি, ড্রিবলিং এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুরো ম্যাচ জুড়ে হাইতির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে কুনহা সুযোগ পেয়ে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। গোলের সামনে তার কার্যকারিতা ব্রাজিলকে নতুন একটি বিকল্প দিয়েছে। এছাড়া রক্ষণভাগও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং গোলরক্ষক আলিসন বেকারকে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি।

তবে ব্রাজিলের কিছু দুর্বলতাও এই ম্যাচে চোখে পড়েছে।

প্রথমত, দলটি এখনো অনেকাংশে ভিনিসিয়াসের ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। যখনই তিনি আক্রমণের কেন্দ্রে থাকেন, ব্রাজিল বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু তাকে নিষ্ক্রিয় করা গেলে দলের আক্রমণ অনেকটাই মন্থর হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই রক্ষণভাগ কতটা দৃঢ় থাকবে, তা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। হাইতির মতো তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে ক্লিন শিট রাখা গেলেও ইউরোপীয় বা দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে একই মান ধরে রাখা ভিন্ন চ্যালেঞ্জ হবে।

তৃতীয়ত, মাঝমাঠে এখনো সেই সৃজনশীলতার ঘাটতি রয়েছে, যা অতীতের সেরা ব্রাজিল দলগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করলে ভিনিসিয়ুস ও কুনহা নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। তারা ম্যাচের গতি নির্ধারণ করেছেন এবং প্রতিপক্ষকে বারবার সমস্যায় ফেলেছেন।

ডিফেন্স লাইনও শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল, যদিও তাদের প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি। কাসেমিরো মাঝমাঠে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন, তবে তার সৃজনশীল অবদান সীমিত ছিল। রাফিনহা এই ম্যাচেও ছিলেন নিষ্প্রভ। প্রথমার্ধের শেষদিকে তিনি চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। অফ ফর্মে থাকলেও বার্সানোর এই খেলোয়াড়টি ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, রাফিনহার চোট নিয়ে ব্রাজিল চিন্তায় থাকবে।

মধ্যমাঠে লুকাস পাকেতা দুর্দান্ত খেলেছেন তবে ব্রুবো গিমারেসকে আরো ভালো খেলতে হবে। রক্ষণভাগেও মারকিনহোস ও সান্তোসকে নড়বড়ে মনে হয়েছে। আলিসন খুব বেশি কাজ না পেলেও যখন প্রয়োজন হয়েছে, তখন নির্ভরযোগ্য ছিলেন।

ব্রাজিলের স্ট্রাইকার এন্দ্রিক গুলি করার ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে হাঁসছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরের ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয় না পেলে ব্রাজিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই গ্রুপের শীর্ষস্থানটি হারাবে

দ্বিতীয়ার্ধে কোচ অনেক বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। এসময় তরুণ স্ট্রাইকার এন্দ্রিক ও রায়ানের সাথে মাঠে নামেন ইংলিশ চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তবে, এই অর্ধে ব্রাজিল আর কোনো গোল পায়নি।

পাকেতা নেমে যাওয়ার পর মধ্যমাঠকেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে, তিনটি পয়েন্ট পেলেও আনচেলোত্তিকে পরের ম্যাচে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

ব্রাজিলের পরের ম্যাচটি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে জয় না পেলে ব্রাজিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই গ্রুপের শীর্ষস্থানটি হারাবে।

এই মুহূর্তে গোল ব্যবধানে ব্রাজিল শীর্ষে থাকলেও দুইয়ে থাকা মরক্কো নিজেদের শেষ ম্যাচটি খেলবে দুর্বল হাইতির বিরুদ্ধে। দিনের অপর ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের কাজ সেরে রেখেছে আফ্রিকার দলটি। শেষ ম্যাচে ফলাফল আশানুরুপ না হলে ব্রাজিল গ্রুপের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হিসেবেও শেষ করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে পরের রাউন্ডেই দলটি কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবে।

ফলে, এই ম্যাচের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রাজিল কতদূর যেতে পারে? বাস্তবতা হলো, হাইতির বিপক্ষে জয় বিশ্বকাপ জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। তবে এটি দেখিয়েছে যে মরক্কো ম্যাচের সমস্যাগুলো থেকে দলটি শিক্ষা নিতে সক্ষম হয়েছে। আনচেলত্তির কৌশল ধীরে ধীরে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রভাব ফেলছে এবং আক্রমণভাগে সমন্বয়ও বাড়ছে।

যদি ভিনিসিয়াস বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, কুনহা নিয়মিত গোল করতে থাকেন এবং মাঝমাঠ আরও সৃজনশীল হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রাজিল সেমিফাইনাল বা ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার মতো শক্তি রাখে।

তবু সতর্কতার জায়গাও রয়েছে।

ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপ জিততে শুধু প্রতিভা নয়, ধারাবাহিকতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কঠিন ম্যাচে ফল বের করে আনার ক্ষমতা দরকার। হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছে, কিন্তু তাদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হবে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।