ভারত ১৪০ কোটি মানুষের দেশ হওয়ার পরও কেন ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি?

    • Author, গৌতম ভট্টাচার্য
    • Role, ক্রীড়া সাংবাদিক, কলকাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপে ভারত কি কখনো খেলবে- এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হতাশা সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে শিখেছেন ভারতের ফুটবল প্রেমীরা। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপ, যা 'বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শো' বলেই পরিচিত, সেই অনুভূতিকে আরও একবার উসকে দিয়েছে।

যারা ব্লু টাইগার অর্থাৎ ভারতের পুরুষ জাতীয় ফুটবল টিম সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে (ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের খেলতে যাওয়া নিয়ে) এই প্রশ্নটা একেবারে গতে বাঁধা। কারণ এশীয় অঞ্চলে বাছাইপর্বের প্রাথমিক রাউন্ডের পর কখনো এগোতেই পারেনি ভারত।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো একাধিক ভারতীয় রাজ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক উন্মাদনা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারত অংশগ্রহণ না করলেও বিশ্বকাপের মাঠ থেকে সরাসরি খবর পাঠানোর জন্য স্বীকৃত ভারতীয় সাংবাদিকদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাও চোখে পড়ার মতো।

চারবার বিশ্বকাপ কভার করেছেন, এমন এক প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, "প্রেস বক্সে আমরা প্রায়শই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি যে, ভারত ফুটবল খেলে কি না। এদের মধ্যে বেশিরভাগই আমাদের ক্রিকেট-প্রধান দেশ হিসাবে চেনে।"

তবে শুধু ভারত নয়, প্রতিবেশী তথা বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ চীনও আরও একবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবে ফুটবলের জনপ্রিয়তার নিরিখে এই বাজারটি যে গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারে ফিফা ওয়াকিবহাল। তাই তারা ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচারের চুক্তি করতে একেবারে শেষ মুহুর্তে একটা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়া রাইটস টিম পাঠিয়েছিল ভারতে।

'দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার'

এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়াটা কি তাহলে ভারতের কাছে অধরা স্বপ্নই থেকে যাবে?

ভারতের জাতীয় ফুটবল টিমের সাবেক অধিনায়ক এবং ভারতীয় ফুটবলের সম্ভবত সবথেকে বড়ো নামগুলির অন্যতম, বাইচুং ভুটিয়া মনে করেন, কিছুই অসম্ভব নয়, তবে তার জন্য কোনো শর্টকাট পদ্ধতি নেই।

তার কথায়, "হ্যাঁ, ভারত অবশ্যই (বিশ্বকাপে) খেলতে পারে, কারণ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বিশ্বকাপের ৪৮-টা দলের মধ্যে এশীয় দলগুলোর কোটা বেড়ে আট হয়েছে (নবম দল হিসাবে এবার ইরাক রয়েছে যারা কনফেডারেশন প্লে-অফ-এর মাধ্যমে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে)।আবার উজবেকিস্তান এবং জর্ডানও খেলছে। তবে এর জন্য কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন।"

তিনি জানিয়েছেন, ভারতের মতো বিশাল দেশে প্রতিভার অভাব নেই।

তবে "যার অভাব রয়েছে তা হলো সঠিক পরিবেশ, কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে তৃণমূলস্তরে কোনো কর্মসূচি আমাদের নেই। এটা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগত খেলা, এবং সেখানে কিছু করে দেখাতে গেলে আমাদের সময় দরকার।"

১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে যেবার ভারত ব্রোঞ্জ পদক জেতে, সেই দলে ছিলেন ফুটবলার শ্যাম থাপা, গোলও করেন তিনি। সেটাই ছিল মহাদেশীয় পর্যায়ে ভারতের শেষ বড় সাফল্য। বছর ৭৮-এর এই সাবেক ফুটবলারও তৃণমূল স্তরে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। তার কথায়, আসল বিষয়টা হলো শিশুরা যাতে আরো বেশি করে ফুটবল খেলতে আসে।

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে বিরক্তির সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাইসাইকেল কিক মেরে গোল করার জন্য বিখ্যাত এই বুদ্ধিদীপ্ত স্ট্রাইকার আক্ষেপ করে বলছিলেন যে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ফুটবল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যাচ্ছেন।

"আমি নিজেও বহু বছর ধরে একটা যুব একাডেমি চালিয়েছি এবং এ কথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে শিশুরা যত বেশি এই খেলার প্রতি আগ্রহী হবে , তত বেশি প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করার জন্য অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) কী করেছে?"

শ্যাম থাপা আরও বলছিলেন যে, অনেক ভারতীয় অভিভাবক সন্তানদের ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছেন এই আশায়, যে ভবিষ্যতে তারা হয়তো "লোভনীয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট) চুক্তিতে সই করতে পারবে"।

"তাদের বুঝতে হবে যে ফুটবলেও যদি তারা কেরিয়ার গড়তে পারে, তাহলেও ভাল অর্থ উপার্জন করা সম্ভব," বলেছেন মি. থাপা।

এবছর এশিয়া থেকে যে নয়টি দল বিশ্বকাপে খেলার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে, তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে ভারতকে কত কিছু করতে হবে।

এই তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব এবং ইরাক। এর মধ্যে জর্ডান ও উজবেকিস্তান তাদের বহু প্রতীক্ষার পরে এই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে।

বিশ্বকাপে নবাগত দুটি দলই বর্তমান ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ভারতের থেকে অনেকটা উপরে রয়েছে।

উজবেকিস্তান বিশ্বে ৫২তম এবং জর্ডান ৬৩তম স্থানে রয়েছে। গত দেড় বছরে পারফর্মেন্সের অবনতির পর ভারত ১৩৬তম স্থানে নেমে গিয়েছে।

এই র‍্যাঙ্কিং থেকেই বোঝা যায় যে ভারতীয় ফুটবলের সামনে কত বড়ো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি

কল্যান চৌবেই প্রথম এআইএফএফের সভাপতি, যিনি একজন সাবেক ফুটবলার।

২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পরে তিনি বলেছিলেন, "আমি এই স্বপ্ন দেখাব না যে ভারত আট বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে খেলবে। বরং আমি বলব আমরা ভারতীয় ফুটবলকে তার বর্তমান অবস্থা থেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।"

এরপর প্রায় চার বছর কেটে গেছে, প্র্রশ্ন উঠছে যে তার প্রশাসন কি সেই উদ্দেশ্যে সফল হয়েছে?

অনেকের মতে, ভারতীয় ফুটবলের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা তো দূরের কথা, গত তিন বছরে এআইএফএফ উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছে।

ফেডারেশন ২০১৪ সালে বেশ জাঁকজমক করে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) নামে ঘরোয়া ক্লাব-ভিত্তিক ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করেছিল। আইএসএল-এর সঙ্গে বলিউড, বাণিজ্য এবং ক্রিকেট জগতের বড় বড় তারকাদের নামও জুড়েছিল। পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হতো আইএসএল। নামী বিদেশি খেলোয়াড়দের আকৃষ্টও করেছিল এই টুর্নামেন্ট। কিন্তু এখন আইএসএল-এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের জন্য কোনো স্পন্সর না পাওয়ায় আইএসএলের সর্বশেষ মৌসুম অনেকটাই দেরিতে শুরু হয় এবং কয়েকশো ফুটবলার নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সব মিলিয়ে আইএসএল নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার হয়েছিল।

শেষপর্যন্ত ফেডারেশন কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার ছাড়াই আইএসএল-এর একটা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ করতে বাধ্য হয়। এখন অবশ্য পরবর্তী মৌসুমের জন্য আবার নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছে এআইএফএফ।

এই আবহে মি. চৌবের 'ভিশন ২০৪৭' কে একটা উচ্চাভিলাষী রোডম্যাপ বলেই মনে হতে পারে। ওই পরিকল্পনায় সাড়ে তিন কোটি শিশুকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রতিশ্রুতি ছিল। আর উচ্চাকাঙ্খী লক্ষ্য এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ফারাক ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

২০২৩ সালে অবশ্য ভারতীয় ফুটবলে সংক্ষিপ্ত পুনরুত্থান লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ওই বছর একটা আমন্ত্রণমূলক ম্যাচ জিতে ফিফার বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথম একশোর মধ্যে চলে আসে ভারত। এসএএএফ (সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডেরেশন) চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছে ভারত। তারপর অবশ্য তেমন বড় সাফল্য আসেনি।

২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের জন্য এএফসির (এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন) বাছাই পর্বে প্রথমবারের মতো তৃতীয় রাউন্ডে ওঠার আশা জাগালেও শেষপর্যন্ত তা তো হয়ইনি, এমনকি আগামী বছরের এএফসি এশিয়ান কাপে অংশগ্রহণ করার জন্য যোগ্যতা অর্জন করতেও ব্যর্থ হয়েছে ভারত।

এশিয়ান কাপে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই এখন প্রাথমিক অগ্রাধিকার, যে টুর্নামেন্টে এশিয়ার ২৪টা শীর্ষ দল অংশ নেয়।

'আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে'

কয়েক বছর আগে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় ভারতীয় ফুটবল টিমের সাবেক অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী বলেছিলেন, বাস্তবের কথা মাথায় রেখেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা দরকার।

অবসর ঘোষণা করার পরেও ২০২৫ সালে খেলায় ফিরে আসা এই ফুটবলারের কথায়, "আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে এবং এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সব এশিয়ান কাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করা। কারণ এটা আমাদের আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে সাহায্য করবে।"

"যখন আমরা এশিয়ার শীর্ষ ১৫-২০টা দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, একমাত্র তখনই বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের মান আরো উন্নত করার কথা ভাবতে পারব।"

এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অবশ্য হতাশাজনক। এআইএফএফ-এর তরফে যদিও নীতিগত পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে যাতে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়রা যারা ওসিআই কার্ড হোল্ডার হিসেবেও পরিচিত, তারা ভারতের হয়ে খেলতে পারবেন।

বর্তমানে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো খেলোয়াড়কে ভারতের হয়ে খেলতে হলে তার বিদেশি পাসপোর্ট ত্যাগ করতে হয়। যেমন অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া রায়ান উইলিয়ামস করেছিলেন। ভারতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের মাধ্যমে দ্রুত নিজের যোগ্যতাও প্রমাণ করেছিলেন।

এই ধরনের নীতি পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে তা একটা উল্লেখযোগ্য বদল দেখা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

চলতি বছরের বিশ্বকাপে চারজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কাতারের হয়ে তাহসিন মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিশান ভেলুপিল্লাই, নিউজিল্যান্ডের হয়ে সরপ্রীত সিং এবং কঙ্গোর হয়ে স্যামুয়েল মুতুসামি খেলছেন।

তবে আপাতত, এই সমস্ত কিছুই এখনও সম্ভাবনার স্তরে রয়েছে।

যতদিন না এগুলো বাস্তবায়িত হয়, ততদিন ভারতীয় ফুটবল প্রেমীরা দূর থেকেই ফুটবল বিশ্বকাপ দেখবেন, মেসি, রোনালদো ও নেইমারদের জন্য গলা ফাটাবেন এবং একই সঙ্গে কুরাসাও-এর মতো দেশগুলোর সাফল্যে অবাকও হবেন। ক্ষুদ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপ কুরাসাও ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে আসা সবচেয়ে ছোট দেশ।

একইসঙ্গে একটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাবে- কুরাসাও যদি পারে তাহলে ভারত কেন পারবে না?