ইরান যুদ্ধে বিলিয়ন ডলার খরচের তথ্য দিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আরো অর্থ চাইছে পেন্টাগন

    • Author, সারিন হাবিশিয়ান এবং গ্যারি ও ডোনাগ,
    • Role, চিফ নর্থ আমেরিকান করেসপনডেন্ট, ওয়াশিংটন ডিসি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৭ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যেটি মে মাসের হিসাবের চেয়ে প্রায় আট বিলিয়ন ডলার বেশি বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির সামনে প্রথমদিন উপস্থিত হয়ে হেগসেথ বলেন, আইনপ্রণেতারা জরুরি ভিত্তিতে নতুন তহবিল অনুমোদন না করলে সামরিক প্রশিক্ষণ কমিয়ে আনতে হবে।

তিনি জানান, নিজের মন্ত্রণালয়ের জন্য কংগ্রেসে ৮৭ বিলিয়ন বা আট হাজার ৭০০ কোটি ডলার চেয়েছেন, যার মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন বা ছয় হাজার ৭০০ কোটি ডলার বরাদ্দ থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য।

এই বৈঠকটি কয়েকবার যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীদের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তারা এ সময় চিৎকার করে বলছিলেন, "ইরান ও ফিলিস্তিনে আমাদের সন্তানদের ওপর বোমা হামলা বন্ধ করো।"

মধ্যপ্রাচ্যে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের একটা সংকটময় মুহূর্তে হেগসেথ এই কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হন।

হোয়াইট হাউস এপ্রিল মাসে আগামী অর্থবছরের জন্য পেন্টাগনের জন্য কংগ্রেসের কাছে এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার চেয়েছে, এই অর্থ অনুমোদিত হলে আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

মঙ্গলবার টানা ১১ দিনের মতো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ মঙ্গলবারের বৈঠকে বক্তব্য শুরু করে বলেন, "আমরা একটি বিপজ্জনক পৃথিবীতে বাস করছি" এবং এর জন্য সাহসী ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়ার পর হেগসেথ আবার বলতে শুরু করেন, এক জরুরি মুহূর্তে তার এই তহবিল বরাদ্দের দাবিটি এসেছে।

তিনি আরো বলেন, শত্রুপক্ষ যেন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলতে না পারে, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল।

হেগসেথ বলেন, "এই তহবিল বরাদ্দ না পেলে আমরা চরম ঘাটতির মুখে পড়বো, এর ফলে সেনা সদস্যদের বেতন দেওয়া, দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের অভাব পূরণ করা এবং কোনো বাধা ছাড়া মূল অভিযানগুলো পরিচালনার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে।"

তিনি আরো বলেন, বরাদ্দ করা প্রতিটি ডলার মার্কিন সামরিক বাহিনীর "মারাত্মক আঘাত হানার সক্ষমতা" বাড়াতে এবং "শক্তির মাধ্যমে শান্তি সুদৃঢ়" করতে ব্যবহার করা হবে।

সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির চেয়ারওম্যান ও রিপাবলিকান নেত্রী সুসান কলিন্স হেগসেথকে প্রশ্ন করেন, বাজেটের চাহিদা পূরণ না হলে এর কী প্রভাব পড়বে।

হেগসেথ বলেন, এই তহবিল বরাদ্দ না পেলে সামরিক সদস্যদের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ কমিয়ে দিতে হবে।

এই সময় তিনি সামরিক খাতে অল্প তহবিল বরাদ্দের জন্য বারবার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেন।

এই কমিটির সবচেয়ে সিনিয়র ডেমোক্রেট সদস্য প্যাটি ম্যুরে এই তহবিলের বিরোধীতা করে বলেন, "এটার কোনো অর্থ হয় না।"

একইসঙ্গে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে "স্বাভাবিক তহবিল অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার" চেষ্টার অভিযোগ তোলেন ওই ডেমোক্রেট সদস্য।

এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে কত খরচ হয়েছে আনুমানিক কোনো হিসাব আছে কী না ডেমোক্রেট সিনেটর ডিক ডারবিনের করা এমন প্রশ্নে হেগসেথ ৩৭ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের তথ্যটি প্রকাশ করেন।

ডেমোক্র্যাটদের দুইটি সূত্র এবং ঘটনাটি জানে, এমন তৃতীয় একটি সূত্র বিবিসির মিডিয়া পার্টনার সিবিএসকে জানিয়েছেন, তাদের মতে ইরান যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আরো অনেক বেশি। এর কারণ ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর পুনর্নির্মাণের মতো খরচগুলো বর্তমান হিসাবের সাথে ধরা হয়নি।

পেন্টাগন প্রধান যুক্তি দেন যে, যদি এই তহবিল অনুমোদন হয় তাহলে এটা হবে একটা "প্রজন্মভিত্তিক বিনিয়োগ"।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে পড়া বা অন্যদের পেছনে দৌড়ানোর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবে এবং মার্কিন বাহিনীকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখবে বলে মন্তব্য করেন পেন্টাগন প্রধান।

গত ১২ই মে থেকে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কোনো খরচের হিসাব দেওয়া হয়নি, তবে এই সময়ে পেন্টাগনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এই খরচের পরিমাণ ২৯ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছিলেন।

এর আগে, পেন্টাগন আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিল, এই যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার।

গত এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে রাজী হয়েছিল কিন্তু সেই চুক্তি ভঙ্গ করা হয় এবং গত সপ্তাহ থেকে আবার যুদ্ধ শুরু হয়।

মঙ্গলবারের শুনানিতে নিউইয়র্কের ডেমোক্রেট সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্রান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, আমেরিকান নাগরিকরা যখন "পরিবারের খাবার যোগাতে পারছে না" তখন তার প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে "বোমা কেনার জন্য সীমাহীন অর্থ চাইছে।"

মিজ গিলিব্রান্ড প্রশ্ন তোলেন, যে যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আগেই জয়লাভের দাবি করেছেন সেই যুদ্ধের জন্য কেন হেগসেথ হাজার কোটি ডলার চাইছেন।

হেগসেথ বলেন, "আমি সঠিক সময়ে সঠিক বোমার দাবি করছি।"

হেগসেথ এবং ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্সের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে দিয়ে মঙ্গলবারের এই শুনানি শেষ হয়।

পিটার্স হেগসেথকে একজন "ব্যর্থ" ব্যক্তি অভিহিত করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি "কখনো শেষ না হওয়া যুদ্ধ" তৈরি করেছে।

"আপনার লজ্জা হওয়া উচিত" হেগসেথ পিটার্সকে লক্ষ্য করে বলেন, মিশিগানের এই সিনেটর "ট্রাম্প বিদ্বেষী সিন্ড্রোমে ভুগছেন।"

বেশিরভাগ ডেমোক্রেটরাই এই বাড়তি তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন এবং রিপাবলিকানদের নিজেদের মধ্যেও এটা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।

রিপাবলিকান পার্টির কট্টর বাজেট সচেতন নেতাদের কেউ কেউ চান, এই ঘাটতি মেটাতে অন্য খাতগুলোর খরচ কমানো হোক।

হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ আগামী বৃহস্পতিবার ছুটিতে যাচ্ছে এবং সেপ্টেম্বর মাসের আগে কংগ্রেসের এই দুই কক্ষের যৌথ অধিবেশন আর বসছে না।

এমনকি রিপাবলিকানরা যদি পর্যাপ্ত ভোট জোগাড় করতে সক্ষমও হয়, তাহলেও পেন্টাগনের হাতে এই তহবিল পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস লেগে যাবে।

হেগসেথের এই শুনানির সময় হোয়াইট হাউজে অবস্থানরত ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী এবং অধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যেখানে সেগুলোর মেয়াদ ও নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধে এই পর্যন্ত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার পেন্টাগন ইরাকে নিহত ৩০ বছর বয়সী মার্কিন সেনা সদস্য সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করে।

এই সংস্থা আরো জানিয়েছে, জর্ডানে ২৮ বছর বয়সী আরেক মার্কিন সেনা সদস্য সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল র‍্যাম্পারসাদ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একদিন আগে জর্ডানে যুদ্ধে নিহত আরো দুই মার্কিন সেনা সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।

তারা হলেন ১৯ বছর বয়সী পিএফএস ইসাবেলা গঞ্জালেস এবং ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার ফিহান।

মার্কিন পতাকা জড়ানো সেনা সদস্যদের কফিন দেশে পৌঁছানোর পর বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।