'গুমের' অভিযোগ, ঠিক কী ঘটেছিল মোংলার মিরাজ শেখের সাথে?

ছবির উৎস, Liza Islam
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা মোংলার নিখোঁজ জেলে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে এটিই গুমের প্রথম ঘটনা বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এই ঘটনায় দেওয়া প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়ার আগে মি. শেখকে সর্বশেষ কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল।
এদিকে, বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়োজিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোস্ট গার্ড বলছে, আনুষ্ঠানিকভাবে হাইকোর্টের ওই আদেশটি এখনো পায়নি সংস্থাটি।
হাইকোর্টের আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনকে প্রশ্ন করলে বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, গণমাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন।
আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে চাননি তিনি, তবে বলেন, "আমরা বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে অবগত হয়েছি। হাইকোর্টের আদেশটি এখনো অফিসিয়ালি আমরা পাইনি। আদালত থেকে কোনো নোটিশ আমরা পাইনি, পাওয়া সাপেক্ষে আমরা প্রয়োজনীয় জবাব বা তথ্য উপস্থাপন করবো এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা পরিপূর্ণভাবে আমরা প্রতিপালন করবো।"
হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে হাজির করার আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
অন্যদিকে, নিখোঁজ মি. শেখের বোন লিজা ইসলামের দাবি, ঘটনার পর থেকে তারা এখনো নানা ধরনের হুমকির শিকার হচ্ছেন।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Getty Images
মিরাজ শেখের সাথে ঠিক কী ঘটেছিল?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী গত ১০ই এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে কোস্টগার্ডের সদস্যদের মিরাজ শেখকে স্পিড বোটে করে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
পরদিন তার পরিবার মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের মি. শেখ "একটি অভিযানে আছেন" ও বিকেলে ফিরবেন বলে জানানো হয়।
কিন্তু তার পরিবার বিকেলে সেখানে আবার গেলে কোস্টগার্ড তাদের জানায়, মিরাজ শেখ সেখানে কখনোই ছিলেন না- হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবিসি বাংলা মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছে।
তিনি জানান, মাছ ধরার পাশাপাশি মিরাজ শেখ ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালাতেন। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে তিনি বাগেরহাট-মোংলায় ভাড়ায় সেটি চালাতেন।
বোনের ভাষ্য, ১০ই এপ্রিল ঘটনার দিন ভোর চারটায় মাছ ধরতে ঘর থেকে বের হন মিরাজ শেখ। সকাল ১১টার দিকে ঘরে ফিরে খেয়ে ঘুমান তিনি। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ভাত খেয়ে বাড়ির কাছাকাছি একটি চায়ের দোকানে যান মিরাজ। সেসময় তার মোটর সাইকেলটিও সেখানে ছিল।
লিজা ইসলাম বলেন, আল আমিনের চায়ের দোকানে যান তার ভাই। "ওই চায়ের দোকানের ঠিক উল্টো দিকে নদীর ভেতরে কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন। ওই স্টেশন থেকে দুইজন কোস্টগার্ড ও আমাদের গ্রামের মাঝি মিজান যে তাদের বোট চালায়, তারা নদীর পাড়ে চায়ের দোকানের সামনে এসে আমার ভাইকে ধরে মারধর শুরু করে।"
সেসময় আশেপাশে শ'খানেক মানুষ সেখানে জড়ো হয় বলে জানান তিনি।
এ সময় মিরাজ জানতে চান- তিনি কী করেছেন, অপরাধ কী। তাকে তারা উত্তর দেয়- "পরে জানতে পারবে", বলেন লিজা ইসলাম।
তিনি জানান, ছোট নৌকায় তার ভাইসহ চারজন যাওয়া যাবে না বলে আরেকটি নৌকায় যায় কোস্টগার্ডের দুইজন এবং পরে নদীর ভেতরে থাকা হারবাড়িয়া কোস্টগার্ডের পন্টুনে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়।
লিজা ইসলাম বলেন, এরপর পন্টুনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই কক্ষের থাই গ্লাস কালো কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
"ওই মুহূর্তে আমার ভাবীসহ মা-বাবা সবাই উপস্থিত ছিল, সবাই নিজের চোখে দেখে এবং গ্রামবাসীও ছিল। কম্বল টানানোর পরে আমার ভাইয়ের অনেক চিৎকার শোনা যায়, আমার ভাইকে অনেক মারধর করে," বলেন মিজ ইসলাম।
তিনি দাবি করেন, এর আধা ঘণ্টা পরে সেখানে কোস্ট গার্ড লেখা একটি স্পিডবোট আসে, যেটিতে করে মি. শেখকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কোথায় নেওয়া হয় তা জানানো হয়নি পরিবারকে।
"আট থেকে দশজন সবাই ইউনিফর্ম পরে ছিল। তারা ওই স্টেশনে উঠে ওর সাথে ছবি ও ভিডিও করে। আমার ভাইকে ওরা ধাক্কা দিয়া বোটে ফেলায়। ওকে এতটা মারছিল যে ও হাঁটতে পারছিল না, খোঁড়ায় খোঁড়ায় হাঁটছিল," বলেন লিজা ইসলাম।
তিনি জানান, মিরাজের মোটর সাইকেলটি সেসময় ওই চায়ের দোকানেই ছিল।
পরে তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন স্থানীয় মেম্বারকে তার স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করলে তিনি হারবাড়িয়া স্টেশন কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তাকে ফোন করেন। তবে তিনি রিসিভ করেননি বলে দাবি করেন মিজ ইসলাম।
পরে মুক্তা খাতুন নিজেই ওই কর্মকর্তাকে ফোন করলে রিসিভ করেন তিনি।
মিজ ইসলাম বলেন, "ওই কর্মকর্তা বলেন, তোমার স্বামীকে নিয়েছি আমরা সন্দেহভাজন হিসেবে। যদি কোনো অপরাধ পাই তাহলে মামলা দেবো। যদি অপরাধ না পাই তাহলে ছেড়ে দেব দুই-তিনদিন পরে।"

ছবির উৎস, Liza Islam
এ সময় তার সাথে ১০ মিনিটের মতো কথা হয় এবং ১০ই এপ্রিল থেকে তিনদিন কোস্ট গার্ডের ওই স্থানীয় কর্মকর্তার সাথে মিরাজ শেখের স্ত্রীর কথা হয় বলে দাবি করেন লিজা ইসলাম।
মিরাজ শেখের নিখোঁজের পর কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক বরাবর তার সন্ধান চেয়ে স্ত্রী মুক্তা খাতুন একটি আবেদন করেছিলেন। সেটি তার আইনজীবী বিবিসি বাংলাকে দিয়েছেন।
ওই আবেদনটিতে কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, "১০, ১১ ও ১২ই এপ্রিল পল্টন কোস্ট গার্ডের একজন সদস্যের (সিসি) সাথে আমাদের একাধিকবার কথা হয় এবং তিনি স্বীকার করেন যে মিরাজ তাদের হেফাজতে আছে।"
স্বামীকে খুঁজতে সেখানেও মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন যান বলে উল্লেখ করেন লিজা ইসলাম। তিনি জানান, কোস্টগার্ডের সদস্যরা মুক্তাকে বলেন, মিরাজ নামে কোনো লোক আসেনি সেখানে।
"আমার ভাবি অনেক কান্নাকাটি করার পর বলে, মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হচ্ছে" বলেন মিজ ইসলাম। পরে মুক্তা খাতুনকে বিকেল চারটায় যেতে বলা হয়।
বিকেল চারটায় সেখানে গেলে এই নামে কাউকে আটক করা হয়নি বলে জানান কতর্ব্যরত কোস্ট গার্ড সদস্যরা। তারা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে বলে মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানান, "কোস্ট গার্ডের সদস্যরা সেদিন তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, এটাও ঘটনা সত্যি। পরে আসলে তাকে নিয়ে একটা অভিযানে যায়। কিন্তু তার পরিবার স্থানীয় প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে বিভিন্ন মহলে কথা বলায়। তার হদিস পাওয়া যায় নাই। পরে তারা সেটা পুরাই লুকিয়ে ফেলে। এখনো মিরাজ শেখ নিখোঁজ এটাতো সত্যি।"
এদিকে, মোংলা থানা পুলিশ প্রথমে জিডি নিতে অসহযোগিতা করেছিল বলে দাবি করেছেন মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলাম। পরে ২৩শে এপ্রিল থানায় জিডি করা হয়।
তবে, মোংলা থানা পুলিশ অসহযোগিতার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
মোংলা থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, "এটা সঠিক নয়। ২১ তারিখেই তারা এসেছিল, আমরা জিডি নিয়েছিলাম।"
তিনি ১৫ই এপ্রিল ওই থানায় যোগদান করেছেন। তবে এর আগে, তারা থানায় এসেছিল কি না বিষয়টি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা জিডিতে কোস্টগার্ডের কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ করেনি বলে জানান মি. রহমান।
মোংলা থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, "২১শে এপ্রিল মিরাজের ফ্যামিলি একটা নিখোঁজ জিডি করে। সেটাতে কাউকে সন্দেহ করেনি, বাসা থেকে নিখোঁজের কথা শুধু বলেছে। জিডিতে বলেছে, মিরাজ শেখ বাসা থেকে বিকালের দিকে বের হয়েছিল। তারপর থেকে নিখোঁজ।"
এছাড়া, কোস্ট গার্ডের জাহাজ বা কার্যালয় ভাঙচুরের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে, মিরাজ শেখের বাইকটি নিয়ে যাওয়ার পর ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ভাইয়ের খোঁজ চেয়ে মানববন্ধন করা হয় এবং সেখানে কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাদের হামলা ও মারধর করে বলে দাবি করেন লিজা ইসলাম।
পরে মিরাজ শেখকে ফিরে পেতে তার স্ত্রী, বোন ও মা হারবাড়িয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনে গিয়ে অনুরোধ করলে তাদেরও মারধর করা হয় বলে দাবি করেন লিজা ইসলাম।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়একজন সাংবাদিক জানান, মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা কোস্ট গার্ডের সদস্যদের সাথে কথা বলতে গেলে উভয়ের মধ্যে বাকবিতন্ডা হয়েছিল। সেখানে মিরাজের পরিবার লাঞ্ছনার শিকার হলে এলাকাবাসী জড়ো হয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এনে কোস্ট গার্ড মামলা দায়ের করেছে বলে জানান লিজা ইসলাম।
"ওরা আমাদের ওপর অনেক অত্যাচার করছে, আমাদের তিনজন মহিলাকেই আটকায়ে রাখছিল। আমাদের থানায় পাঠায়ে গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার করে এবং অনেককে আটক করে। এমনকি যারা গ্রামের বাইরে থাকে তাদের নামেও মামলা দিয়েছে। ৩০০ জন অজ্ঞাত এবং ৪০ জন গ্রামবাসীর নামে মামলা দিয়েছে। আমরা ২৭ দিন কারাগারে ছিলাম" বলেন লিজা ইসলাম।
তাদের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান মিজ ইসলাম।
পরে নয়ই জুলাই জামিনে মুক্ত হন গুমের শিকার মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম এবং তার মা।
পরে মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে তার পরিবার হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন জানান, ওই আবেদনের শুনানি করে ১২ই জুলাই হাইকোর্ট মিরাজ শেখ কোথায়, কী অবস্থায় আছেন এবং তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে।
"আদালত রুল ইস্যু করছে এবং ডিরেকশন দিয়েছে তাকে কোর্টে হাজির করার জন্য, অথবা তার অবস্থান, কোথায় কী অবস্থায় আছে এটা কোর্টকে অবহিত করার জন্য। আদেশ পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এটা করতে বলা হয়েছে," বলেন মি. শাহীন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী প্রতিবেদনে বলেছেন, "শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি নির্দেশ করে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এমন ঘটনা আবার ঘটতে পারে।"
"এটি স্পষ্ট যে, এই ধরনের সংস্কৃতি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে। তাই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত, গুম প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা"এ কথা বলেছেন মীনাক্ষী গাঙ্গুলী।








