আইনশৃঙ্খলা 'নিয়ন্ত্রণে আছে, অবনতি হয়নি' বলা হলেও এখনো উদ্বেগ কেন?

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

"আগের চেয়ে অনেক ইমপ্রুভ করেছে। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার হয়েছে। সন্ত্রাসী- চাঁদাবাজদের তালিকা করে অভিযান চলছে। অনেককে আটক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কিছু অপরাধ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে, অবনতি হয়নি"।

বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে এই কথাগুলো বলছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি "বেশ উন্নতি করেছে" বলেই মনে করছেন তারা।

শুক্রবার বাংলাদেশে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আলী হোসেন ফকির ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পুলিশের কিছু যে বিশৃঙ্খলা ছিল তা অনেকাংশে সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হয়েছে।

তবে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন পরিস্থিতি। ছিনতাই, চাঁদাবাজির খবর প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় উঠে আসে।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভাগুলোতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এবং চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের জড়িত হয়ে পড়াই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বড় কারণ।

ওদিকে মব বা দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনাও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে- এপ্রিল মাসেও মব সহিংসতায় অন্তত ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষকদের অনেকের কথাতেই আইনশঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি এখনো উঠে আসছে।

রোববার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনের পুলিশ সপ্তাহ। ফলে এই সময়ে আবার পুলিশের সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন, "পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় পুলিশের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য"।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলছেন যে, সরকারের আড়াই মাসেই পুলিশ বাহিনী সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে উঠেছে এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

"একই সাথে জনমনেও আস্থা ফিরে এসেছে। সে কারণেই সেনাবাহিনীকে মাঠ পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

উদ্বেগ কেন

পুলিশ বলছে, চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে গত চব্বিশ ঘণ্টায় শুধু ঢাকাতেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

সবমিলিয়ে চলতি মাসের প্রথম সাত দিনে আটক হয়েছে ৯০০ জনের বেশি।

কিন্তু এরপরেও ছিনতাই চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছেই। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে সড়ক মহাসড়কে যানবাহন ঠেকিয়ে বা আটকে বিভিন্ন কায়দায় ছিনতাই ডাকাতির নিত্যনতুন ভিডিও দেখা যাচ্ছে।

এমনকি ঢাকার কাওরানবাজারসহ কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যেই ছিনতাইয়ের বেশ কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মাসিক পর্যালোচনা সভায় চাঁদাবাজির সাথে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ তুলেছেন বিভিন্ন থানায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তারাই।

জবাবে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকার একটি থানার একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

"সরকারি দলের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সে কারণেই প্রসঙ্গটি উঠেছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ওই কর্মকর্তা। তিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।

ওদিকে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের জের ধরে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা সামাল দিয়ে উঠলেও পুলিশকে পুরোপুরি কার্যকর এখন করা গেছে কি-না সেই প্রশ্ন আছে অনেকের মধ্যে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলন চলার সময় অনেক থানায় হামলা করে যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছে, সেগুলোর সব এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্র পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে কি-না তা নিয়েও উদ্বেগ আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরস্কার ঘোষণার পরও এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট এক হাজারের বেশি অস্ত্র ও প্রায় আড়াই লাখ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এগুলো বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়েছিল।

পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে তৎপরতা, আর পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার করতে না পারাটাও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে ভূমিকা রাখছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে গত ৩০শে এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ কমিটির সভাপতি।

জানা গেছে, এই কমিটি গঠন সংক্রান্ত সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী দুই মাসের মধ্যে পুলিশের লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর থেকে এ নিয়ে বিশেষ তৎপরতা শুরু হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে মনে করা হচ্ছে লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গেছে এবং কিছু ঘটনায় সেগুলো ব্যবহারও করা হয়ে থাকতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে ঢাকায় কয়েকটি নতুন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

"একদিকে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো এবং অন্যদিকে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। এগুলো পরিস্থিতিতে আরও ভালো করবে," বলছিলেন পুলিশের মুখপাত্র শাহাদত হোসাইন।

কিন্তু তারপরেও বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড, ফুটপাত ছাড়াও গার্মেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে কিংবা চেষ্টা হচ্ছে বলে খবর আসছে প্রতিনিয়ত। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এমনকি জেলা পর্যায়েও এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের যে তালিকা পুলিশ করেছে সেখানে রাজনীতিতে জড়িত অনেকের নাম আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ঢাকার বাইরেও কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানায় গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একটি শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। খুলনার বটিয়াঘাটায় আজিজুল ইসলাম নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা, শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এই খুলনাতেই গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে এমন একজন ব্যক্তিকে গুলি করার পর তাকে ঢাকায় আনার পথে তাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করেও গুলির ঘটনা ঘটেছে গত ৪ঠা মে রাতে।

এর আগে সম্প্রতি ঢাকায় পুলিশের ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হওয়ার পর তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে নিজেদের মধ্যে তারা দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়াচ্ছেন এমন খবরও আসছে সংবাদ মাধ্যমে। এদের মধ্যে কয়েকজন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, এসব সন্ত্রাসীদের অনুসারীরা ঢাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজিতে যুক্ত বলে পুলিশ মনে করছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে যে ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত, সেটি এখনো হয়নি বলেই আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

"২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন ও জন আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলেই পুলিশ তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পায়নি। এ কারণেই অপরাধ বাড়ছে ও অপরাধীরা বেশি তৎপর হতে পেরেছে"।

"তারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালীদের আনুকূল্য পাচ্ছে। এ কারণে চাঁদাবাজি এমন মাত্রায় গেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়া পুলিশী বাহিনী সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে উঠবে- এটা জনগণের প্রত্যাশা ছিল ।

"আমরা মনে করি সরকারের আড়াই মাসেই তারা সেই সক্রিয় অবস্থানে আসতে পেরেছে। তারা এখন আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং সে কারণে মানুষের মধ্যেও পুলিশকে নিয়ে আস্থা ফিরে এসেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

মি. আহমদ বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর পুলিশের মোটিভেশন এবং কাজ করার সক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

"পুলিশ যথাযথ সক্ষমতা অর্জন করে কাজ করছে। সে কারণে সেনাবাহিনী মাঠ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার হচ্ছে। পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোরও প্রক্রিয়া চলছে," বলছিলেন তিনি।