আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জামায়াত-এনসিপি জোটের লংমার্চে এক দফার ইঙ্গিত
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা নিজেদের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচিতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জনসভা ও পথসভায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সরকার পতনের 'এক দফার' ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তারা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে 'বাধ্য' করবেন- এমন অঙ্গীকারের কথাও জানিয়েছেন এসব সমাবেশে।
এই কর্মসূচিতে 'গণভোটের রায়' বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সংকটের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করে এর বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের সাথে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই লংমার্চের আয়োজন করেছিল বিরোধী এই জোট।
১১ দলীয় ঐক্য জোটের দাবিগুলো হলো—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের লালদিঘীর সমাবেশে শনিবার রাতে বলেছেন, এ আন্দোলন জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।
"জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা আদায় করে ছাড়বো। প্রস্তুত থাকুন। বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে তখনই ডাক আসবে। এ লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে"।
আজকের লংমার্চ "সরকারকে সতর্ক করার জন্য" এমন দাবি করে তিনি বলেন, "বাকিগুলো এমন হবে না। আমাদের বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে। আমরা চেয়েছিলাম সংসদে ফয়সালা হবে"।
এর আগে সকালে কর্মসূচির শুরুতে ঢাকার এক সমাবেশে জোটের অন্যতম দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার এই লংমার্চে বাধা দিলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কুমিল্লায় বলেছেন, "আমরা সরকারকে বলবো- আপনারা দাবিগুলো মেনে নেন। যদি দাবি না মানেন, ছয় দফা একদফা রূপান্তর হবে, সেটা হবে সরকারের পদত্যাগ।"
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে যে গণভোট হয়েছে তার রায় বাস্তবায়নের জন্য জামায়াত ও সমমনা দলগুলো শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এই জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের বিধান না থাকায় সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ ধরনের শপথ নেয়নি।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির জন্য বিরোধী দল থেকে সদস্যদের নাম চাওয়া হলেও তারা তা দেয়নি।
তখন কমিটির গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান।
এরপর থেকে বিরোধী দল থেকে ধারাবাহিকভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ই অগাস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে 'লং মার্চ' ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান।
তার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯শে সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ই অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪শে অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ই নভেম্বর ঢাকায় জোটের মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
লংমার্চে যা হলো
এগার দলীয় জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত এ কর্মসূচির পথে পথে বিভিন্ন জনসভা ও পথসভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
লালদীঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার আগে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পথসভায় জোটের বিপুল সংখ্যক নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা যোগ দিয়েছেন।
মহীপালের সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, "সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। এখন যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদ শুরু করবেন, তাদের ১৫ বছর আর অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করব না। আমরা যেখানে বাধা পাব, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব"।
তিনি অভিযোগ করেন যে, "গত ছয় মাসে শাপলা চত্বরে গণহত্যা, পিলখানার হত্যার মতো বড় বড় গণহত্যার বিচার শুরু হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যতগুলোর বিচার শুরু হয়েছিল, তার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে"।
এছাড়া লংমার্চের গাড়ির বহর ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার পর পথে পথে বিভিন্ন জায়গায় জোটভুক্ত দলগুলো সমর্থকরা সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নেতাদের স্বাগত জানিয়েছেন।
এই লংমার্চের গাড়ির বহর ও বিভিন্ন জায়গায় জনসভা পথসভার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে।
এগার দলীয় জোটের নেতারা এর আগে জানিয়েছিলেন, মহাসড়কের এক পাশ দিয়ে বহর চলবে, যাতে অন্য পাশ দিয়ে সাধারণ যানবাহন চলাচল করতে পারে।
এর আগে আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকায় শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হওয়ার আগে উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এলডিপির প্রেসিডেন্ট অলি আহমদসহ জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
এই সমাবেশে জামায়াতের আমির বলেন যে, দেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন।
"আমাদের কর্মসূচির ওষুধ ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে, বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে," বলেছেন তিনি।
ওই সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, "এ লংমার্চ আপামর জনতার। সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেয়, তাহলে সব বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে এবং ১১ দলের ছয় দফা দাবি এক দফায় রূপ নেবে"।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর 'জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
একই বছরের ১৩ই নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫শে নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।
তার ভিত্তিতে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হয়েছিল।
পরে জামায়াত ও সমমনা দল থেকে নির্বাচিতরা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদে সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা নেয়নি।
এরমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী।
বিএনপির দিক থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ তখন বলেছিলেন "গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের যে ইচ্ছে ও রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হলে সংসদে যেতে হবে আগে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। সে বিবেচনায় আমরাও শপথ নেইনি"।
তিনি আরও বলেছিলেন, "অসাংবিধানিক কিছু আমরা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে পারি না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হতে হলে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে"।
এরপর গত ১৩ই জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়, যেখানে বিরোধী দল থেকে পাঁচজনকে রাখার কথা বলা হয়েছিল।
তবে এ কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।