শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা জারি

কারাকাসে ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া একটি ভবন থেকে উদ্ধারকর্মীরা একজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করছেন। অন্য কয়েকজন উদ্ধারকর্মী অনুসন্ধানে ব্যস্ত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভূমিকম্পের পর কারাকাসে অনেক ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

এক মিনিটের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এখনো হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট নয়, তবে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে। এর ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ৭ দশমিক ৫ ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে।

দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ভেনেজুয়েলার ইউমারে শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।

ইউএসজিএস বলছে, ব্যাপক হতাহত ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—দ্বিতীয় প্রধান ভূমিকম্পের পর ১০ হাজারের বেশি প্রাণহানির আশঙ্কা ৪৪ শতাংশ এবং এক লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা ৩০ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ভেনেজুয়েলা, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল, তবে তা এখন প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ভূমিকম্পের পর ভবন ধসে পড়েছে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ সাহায্যের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে, ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তদারকির জন্য তিনি একজন জেনারেলকে দায়িত্ব দেন।

তার পূর্বসূরি নিকোলাস মাদুরোকে জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী আটক করে মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করে আসছেন।

তার ভাষণে তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সর্বোপরি ঐক্যের আহ্বান জানান।

এছাড়া, ভূমিকম্পে যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান, তবে নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করেননি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে দেলসি রদ্রিগেজ জানান যে, ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা আপাতত বন্ধ থাকবে। এই সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত থাকবে।

কারাকাসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মাইকুয়েতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছাদের একাংশ ধসে পড়ায় সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া একটি ভবনের ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তারা কাজ করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া একটি ভবনের ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তারা কাজ করছেন
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিবেশী কলম্বিয়া পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে।

এএফপি জানায়, ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো জনগণকে তাদের বাড়ি ছেড়ে যেতে বলেছেন। তিনি বলেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বেশ কয়েকটি ভবনে আগে থেকেই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

"কিছু কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমরা গ্যাস-সংক্রান্ত কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটুক তা চাই না," বলেন কাবেইয়ো।

তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার একাধিক অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ত্রুহিয়ো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা, কারাকাস এবং লা গুইরায় এটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাজধানী কারাকাসে পালোস গ্রান্দেস এবং আল্তামিরা এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে, কারাকাসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে যে তারা "ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে"।

তারা জনগণকে "ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করতে" আহ্বান জানিয়েছে।

আরও নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, সর্বশেষ তথ্যের জন্য স্থানীয় গণমাধ্যমে চোখ রাখতে এবং "নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে" হবে।

দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি ধসে পড়া ভবন থেকে একজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি ধসে পড়া ভবন থেকে একজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করছেন

প্রথম ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে আঘাত হানে। ওই সময়টা সাধারণত ব্যস্ততম যানজটের সময় হয়ে থাকে।

তবে ২৪শে জুন ভেনেজুয়েলায় একটি জাতীয় ছুটির দিন। ১৮২১ সালের কারাবোবো যুদ্ধের স্মরণে দিনটি পালন করা হয় যেখানে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা সিমন বলিভার স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছিলেন।

ফলে, সাধারণ কর্মদিবসের তুলনায় এদিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মানুষ ঘরে অবস্থান করছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা ফুটেজে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাসিন্দাদের রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি দুলতে থাকা কাচের আলমারিতে রাখা চীনামাটির জিনিসপত্র ধরে রাখার চেষ্টা করছেন দুই ব্যক্তি, কিন্তু সেগুলো মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আঘাত এটাই প্রথম নয়।

১৯৬৭ সালে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কারাকাসে আঘাত হানলে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সে সময় মধ্যবিত্ত এলাকা পালোস গ্রান্দেস এবং উচ্চবিত্ত এলাকা আল্তামিরায় অনেক ভবন ধসে পড়ে।

এই দুটি এলাকাই বুধবারের ভূমিকম্পেও আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে জানিয়েছেন যে "সেখানে ভবন ধসে পড়েছে"।

এবারের মতোই, ১৯৬৭ সালেও বাসিন্দারা একাধিক কম্পন অনুভব করার কথা জানিয়েছিলেন।

ভূমিকম্পের সময় ব্যানকারিব ব্যাংকের একটি ভবন ধসে পড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভূমিকম্পের সময় ব্যানকারিব ব্যাংকের একটি ভবন ধসে পড়েছে

বৃহত্তর কারাকাস মহানগর এলাকার একটি অংশ চাকাওয়ের মেয়র গুস্তাভো দুকে সায়েজ বলেছেন, তার এলাকায় অন্তত দুটি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে।

তিনি জানান, ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫০০-এরও বেশি জরুরি কর্মী ঘটনাস্থলে আরও বাসিন্দাদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

"প্রতিটি বাসিন্দাকে উদ্ধার করা না পর্যন্ত আমরা এখান থেকে যাব না।"

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করার চেষ্টা করছেন এমন স্থানীয়দের তিনি দুটি প্রধান চত্বর প্লাজা আল্তামিরা এবং প্লাজা লস পালোস গ্রান্দেসে যেতে অনুরোধ করেন। সেখানে স্থানীয় কর্মকর্তারা একটি জরুরি কেন্দ্র স্থাপন করেছেন, যেখানে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পানি ও আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

"শুধু দুটি ভবন ধসে পড়েনি, আরও যেসব ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের তালিকাও আমাদের কাছে আছে।"

লোকজন রাস্তায় দৌড়াচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ

'জীবনে এমন কিছু আগে দেখিনি'

"আমার ভবনের কয়েকটি দেয়াল ফেটে গেছে বা সেখানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে," রয়টার্সকে জানান একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী, পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা কোরো মার্তিনেজ সংবাদ সংস্থাটিকে একটি "খুব জোরালো ধাক্কার শব্দ" শোনার কথা বর্ণনা করেন।

৫৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বলেন, "বাড়ির ভেতরে জিনিসপত্র পড়ে গেছে, ফ্রিজের ভেতরের বোতলও। আমি জীবনে এমন কিছু আগে দেখিনি।"

অবসরপ্রাপ্ত মারিয়া রোমেরো এই ভূমিকম্পটির সঙ্গে ১৯৬৭ সালের কারাকাসের প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনা করে বলেন, এবারেরটি আগের ভূমিকম্পের "চেয়েও খারাপ" ছিল।

বিবিসি মুন্দোর সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার বলেন, "এটি আমার জীবনে অনুভব করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।"

ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সময় তিনি কারাকাসের কেন্দ্রস্থল পালোস গ্রান্দেস এলাকায় একটি আবাসিক ভবনের সপ্তম তলায় ছিলেন।

কোলস্টার বলেন, "আমি দেখলাম জানালাগুলো নড়ছে, আর তখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা আসে—নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রধান দরজা ও একটি পাথরের দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়ানো, যা আমার মনে হয়েছে বেশ মজবুত।"

তিনি বলেন, তিনি "অনেকক্ষণ" সেখানে অবস্থান করেন, যতক্ষণ না পাশের বাসিন্দাদের সবাইকে নিচে রাস্তায় নামতে চিৎকার করতে শুনেন।

তিনি বলেন, "আমি ভেবেছিলাম ভবনটি আমার ওপর ভেঙে পড়বে।"

ভেনিজুয়েলার রাজধানীতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভেনিজুয়েলার রাজধানীতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন
ভবনগুলো খালি করার পর লোকজন কারাকাসের রাস্তায় জড়ো হয়

ছবির উৎস, EPA/Shutterstock

ছবির ক্যাপশান, ভবনগুলো খালি করার পর লোকজন কারাকাসের রাস্তায় জড়ো হয়