রোনালদোর জীবনের অসাধারণ উত্থানের ছয়টি ধাপ

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গতরাতে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করার পর উচ্ছ্বসিত রোনালদো
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

গতরাতে টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে দুই গোল করে নিন্দুকদের মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছেন সিআর-সেভেন নামে পরিচিত পর্তুগিজ তারকা।

বিশ্বকাপে শুরুর ম্যাচে গোল পাননি বলে নিন্দুকেরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন, "রোনালদো কি এখন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় সমস্যা?"

গোল করার পর মাঠে রোনালদোর দিকে তাক করা এক টিভি ক্যামেরায় চোখ রেখে তিনি বলতে থাকেন, "আই অ্যাম ব্যাক! আই অ্যাম ব্যাক!"

শুরু থেকেই জীবন সহজ নয় এ মূহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার, নিজের নামকে একটি ব্র্যান্ডে রূপান্তর করা বিলিয়নিয়ার খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর।

সে কারণেই হয়ত তিনি যখন তার শেষ বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামেন সমালোচকেরা তাকে ছাড় দেননি মোটেও।

একসময় ম্যাকডোনাল্ডসের বাইরে বেঁচে যাওয়া বার্গারের জন্য অপেক্ষা করতেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু আজ তিনি একজন বিলিয়নিয়ার এবং এ গ্রহের সবচেয়ে পরিচিত মানুষদের একজন।

বিবিসির গুড, ব্যাড, বিলিয়নিয়ার পডকাস্টে সম্প্রতি তার জীবনের অসাধারণ উত্থানের ছয়টি ধাপ নিয়ে আলোচনা হয়, সেটাই এই রিপোর্টে তুলে ধরা হলো --

রোনালদো

ছবির উৎস, Getty Images

অল্প দিয়েই শুরু করা

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দোস সান্তোস আভেইরো ১৯৮৫ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের এক ছোট পর্তুগিজ দ্বীপ মাদেইরার এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।

তার বাবা স্থানীয় এক ফুটবল ক্লাবের কিট ম্যানেজার এবং মালি হিসেবে কাজ করতেন। তার ছিল মদ্যপানের সমস্যা।

তার মা রাধুনী এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

রোনালদোর শৈশব কেটেছে দুই রুমের এক ছোট্ট ফ্ল্যাটে, বাকি তিন ভাইবোনের সাথে একটি ঘরে থাকতে হয়েছে তাকে।

কিন্তু রোনালদো কখনোই একে কষ্ট বা দুর্দশা হিসেবে দেখেননি।

"আমরা (জীবনকে) এমনই জানতাম… এবং আমরা সুখেই ছিলাম।"

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শৈশবের অনটনকে কখনোই দুর্দশা হিসেবে দেখেননি রোনালদো

অল্প বয়সেই নিজের আগ্রহ বেছে নেওয়া

রোনালদো ছোটবেলাতেই স্কুলের চেয়ে ফুটবলকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, কারণ এক শিক্ষকের দিকে তিনি চেয়ার ছুড়ে মেরেছিলেন।

রোনালদোর অভিযোগ ছিলো ওই শিক্ষক তাকে 'অসম্মান' করে কথা বলেছিলেন।

তবে, ওই ঘটনার পর তিনি পুরোপুরি খেলায় মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর ১৫ বছর বয়সে একটি হৃদযন্ত্রের সমস্যা তার সব পরিকল্পনা আর স্বপ্নকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

তার একটি বড় অস্ত্রোপচার হয় এবং তার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আবার অনুশীলনে ফিরে যান।

কেবল প্রতিভা নয়...বিরামহীন পরিশ্রম

ফুটবল মাঠে রোনালদোর প্রতিভা তাকে সবার নজরে এনেছিল।

আর বিরামহীন পরিশ্রম তাকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

তিনি তার ক্যারিয়ার গড়েছেন কয়েকটি সাধারণ নীতির ওপর ভিত্তি করে - 'ফার্স্ট ইন, লাস্ট আউট'; মানে সোজা বাংলায় সবার আগে মাঠে আসা এবং সবার শেষে ফেরা - এবং দিনের পর দিন একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি।

এই নীতিতে তিনি তার শরীর ও মনকে অভ্যস্ত করে ফেলেছেন।

আর তার ফলাফল?

পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, শত শত গোল এবং অসংখ্য রেকর্ড।

মাঠে সিআর সেভেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কঠোর অনুশীলনকে জীবনের অংশ করে ফেলেছেন রোনালদো

সাফল্যকে টাকার অঙ্কে রূপান্তর করা

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় তিনি ক্রীড়াজগতের অন্যতম মূল্যবান সম্পদে পরিণত হন।

ক্রমে তার সাথে এসেছে সেই সাফল্যকে টাকার অঙ্কে রূপান্তর করার সুযোগ, আস্তে আস্তে যা তার আয়ের চাকা ঘোরানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে।

সাফল্যের সাথে একে একে আসে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড অ্যান্ডোর্সমেন্ট।

নাইকি, কোকা-কোলা, এনার্জি ড্রিংকস, ঘড়ি... বিশ্বের তাবৎ বড় বড় ব্র্যান্ডের মুখ হয়ে ওঠেন তিনি আর ক্রমে দীর্ঘ হতে থাকে সেই তালিকা...

কেবল সফল প্রোফাইল নয়, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি

আন্তর্জাতিক ব্রান্ডকে প্রতিনিধিত্ব করার পর রোনালদো নিজের একটি ব্র্যান্ড তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।

নিজের নামের অদ্যক্ষর আর জার্সি নম্বর দিয়ে রোনালদোর সিআর-সেভেন ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয় অন্তর্বাস বাজারে আনার মধ্য দিয়ে।

এখন এ ব্র্যান্ড ফ্যাশন, সুগন্ধি, হোটেল, জিম - এমনকি একটি জাদুঘর পর্যন্ত বিস্তৃত।

তার মূলমন্ত্র ছিল - শুধু স্পন্সরশিপ থেকে রোজগার নয়, বরং পণ্য ও সেবায় নিজের মালিকানা অর্জন ও লাইসেন্স নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

সেই কৌশল যে কাজ করেছে - সে তো বলাই বাহুল্য।

বিশ্বকাপে কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বকাপে কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো

ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে সাফল্যের পুরো সুযোগ নেওয়া

বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের গতি তাদের বয়স ৩০ এর কোঠায় এলে কমে যায়।

কিন্তু রোনালদো তার পরিধি আরও বাড়িয়েছেন, ৪১ বছর বয়সেও দারুণ ফর্মে চলতি বিশ্বকাপে খেলতে এসেছেন।

তবে মাঠে এবং মাঠের বাইরে সিআর-সেভেনের হিসাব নিখুঁত, প্রায় অব্যর্থ।

৩৭ বছর বয়সে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের সাথে চুক্তি তাকে বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার এনে দিয়েছিল।

সাথে রয়েছে বাণিজ্যিক চুক্তি ও বোনাস, যা ওই চুক্তিকে বিশ্ব ক্রীড়াজগতের অন্যতম লাভজনক চুক্তিতে পরিণত করে।

এদিকে, ততদিনে রোনালদো তার ক্যারিয়ারের উপার্জনে ইতোমধ্যেই এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক পার করে ফেলেছেন।

অন্যদিকে, সৌদি ক্লাবের সেই দলবদল রোনালদোর সম্পদে কেবল আরও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।