ককরোচ পার্টির আন্দোলন কি মোদী সরকারের জন্য 'বিপদঘণ্টা'?

ছবির উৎস, ANI
- Author, প্রবীণ
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সোমবার, মধ্য দিল্লিতে ভারতের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে সারাদিন ধরে অস্থিরতা ছেয়ে ছিল। কনট প্লেস, জনপথ বা যন্তর মন্তর সব জায়গাতেই হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ভিড় ও জমায়েত চোখে পড়ছিল।
এমনকি অনেক জায়গায় মেট্রো স্টেশন ও রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পরেও, তারা সোমবার সকাল থেকে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।
লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রযোগেও তাদের সরানো যায়নি। পুলিশের তরফ থেকে প্রবল প্রতিরোধের মধ্যেই এই তরুণ-তরুণীরা সকাল থেকে গভীর সন্ধ্যা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে অবস্থান করেন।
প্রায় এক মাস ধরে, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপির নেতৃত্বে দিল্লির জন্তর মন্তরে একটি বিক্ষোভ চলছে।
তবে যে প্রশ্নটা বার বার উঠে আসছে, সেটা হলো, যে দলের ফলোয়ার্স সংখ্যা দুই দিনে ভারতের শাসকদল বিজেপিকে টেক্কা দিয়েছিল, সেই দল বাস্তবের মাটিতে কতটা সফল হবে?
তবে যখন 'দল' হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টিকে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তখন মনে রাখা প্রয়োজন যে এটি কোনো রকম রাজনৈতিক দল নয়। বরং নাগরিক সংগঠন বলা যেতে পারে।
কিন্তু এই দলের কার্যক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছিল, সোমবার ২০শে জুলাই সেই উত্তরটি পাওয়া গেল।
কলেজ ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা শিক্ষার্থীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এসে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সরকারের নীরবতা বজায় রাখা বেশিদিন সম্ভব নয়।
স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মা, যিনি গত এক মাস ধরে এই যুব আন্দোলনটির খবর সংগ্রহ করছেন, তিনি মনে করেন যে এই শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় সরকারকে এই বার্তা দিয়েছে যে, সমস্যাটি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের মতো অন্যান্য বিষয়গুলোকেও সরকার উপেক্ষা করতে পারে না।

ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images
'শুধু নিজের স্বার্থের লড়াই লড়ছে না যুবসমাজ'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ককরোচ জনতা পার্টির তরফ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে সোমবার ২০শে জুলাই সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল আগেই। এই ডাকে সাড়া দিয়ে বহু তরুণ তরুণী দিল্লির রাস্তায় নেমেছেন।
সংসদ অভিযানের শুরুর দিকে, যখন প্রথম প্রথম হাঙ্গামা বাঁধতে শুরু করে, তখন ককরোচ জনতা পার্টি দাবি করে যে সরকার তাদের আলোচনার জন্য ডেকেছিল।
এদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বলেন যে বিক্ষোভকারীরাই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা ইনস্টাগ্রামে বৈঠকটির একটি ছবি পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, "আজ সকালে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সকাল ১১টা ৫০মিনিট থেকে আমাদের আলোচনা চলছে।"
"বৈঠকটি একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে আমরা তাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিস্তারিত মৌখিক আলোচনা করি এবং তারপর তারা বিকেল ৪টার দিকে আমার কাছে একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দেন। আমি সমস্ত বিক্ষোভকারীকে তাদের অবস্থান ধর্মঘট শেষ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ করেছি।"
এত বড় যুব বিক্ষোভ সত্ত্বেও, কেন্দ্রীয় সরকার এখনও সিজেপির মূল দাবি মেনে নেয়নি। সিজেপিও আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, যুবকদের রাস্তায় নামার ফল কী হলো?
আমরা এই আন্দোলনের ওপর নজর রাখা সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলাম।
এই আন্দোলনের সমর্থক সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব সোমবার যন্তর মন্তরে বলেন, "আজ যন্তর মন্তরে আমি যে নতুন প্রজন্মকে দেখছি, তা আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। এই তরুণেরা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছে না।"
যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, যুবসমাজ একটি সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অর্থনীতি এবং এমন রাজনীতির জন্য লড়ছে যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ।
এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক স্মিতা শর্মা বলেন যে, সোমবারের বিক্ষোভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, এত বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে আসবে, তা কেউই আশা করেনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Arun SANKAR / AFP via Getty Images
বিজেপি সরকারের জন্য 'বিপদঘণ্টা'?
স্মিতা শর্মা সোমবারের বিক্ষোভকে একটি নেতৃত্বহীন আন্দোলন হিসেবেও দেখছেন।
তিনি বলেন, "ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। সিজেপি নেতারা তাদের মতামত জানাতে পারছিলেন না। মেট্রো স্টেশনগুলো বন্ধ ছিল। যে কোনও বার্তাই পৌঁছে দেওয়া কঠিন ছিল।"
"আন্দোলনটি ছিল শিক্ষা নিয়ে, কিন্তু বিষয়টি প্রসারিত হয়ে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ভোট চুরির মতো বিষয়গুলোকেও ছুঁয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত এই বিষয়ে আলোচনা করেছে, যা সত্যিই ইউনিক।"
এই আন্দোলনের কারণে ভবিষ্যতে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ কতটা বাড়বে, এই প্রশ্নের উত্তরে স্মিতা শর্মা বলেন, "সরকার যদি এই বিক্ষোভ থেকে কোনো শিক্ষা না নেয়, তবে তা সরকারের জন্য একটি বড় ভুল হবে। কারণ তরুণরা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা সংসদ পর্যন্ত মিছিল করার জন্য মুখিয়ে ছিল। সিজেপি যদি মাঝপথে তাদের সংসদ পর্যন্ত মিছিল করতে বাধাও দিত, তবুও হাজার হাজার মানুষ যন্তর মন্তর থেকে সংসদ পর্যন্ত মিছিল করত।"
"ওদের লাঠি দিয়ে পেটানো সত্ত্বেও, ওরা ফিরে আসছিল, প্রশাসনের মোকাবিলা করছিল। এটি সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, মানুষের মধ্যে এমন ক্ষোভ জমা হয়েছে যে, কথা না শুনলে তা আজ যেমন বেলুনের মতো ফেটেছে, ভবিষ্যতেও তেমনই ফেটে পড়তে পারে।"

ছবির উৎস, Arun SANKAR / AFP via Getty Images
প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রি, স্মিতা শর্মার কথারই প্রতিধ্বনি করে বলেছেন যে, এই যুব-বিক্ষোভ আগামী দিনে মোদী সরকারের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চলেছে।
তিনি বলেন, "এই বিক্ষোভের সাফল্য এটাই যে, এতদিন দেশের মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা মোদী সরকারের ভ্রম তারা ভেঙে দিয়েছে। এমন নয় যে মানুষ চুপচাপ এসে চলে গেছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে এই দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী, এর শিকড় মজবুত। সরকার একে দুর্বল করতে পারে না।"
"যেকোনো দেশের জন্য, শুধু বর্তমানেই নয়, ভবিষ্যতেও যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটা সরকার নির্বাচন হোক বা পরিবর্তন।"
"এটি সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা।" মনে করেন মি. অত্রি।
"তারা বেশিদিন জনগণকে উপেক্ষা করতে পারবে না। সরকারকে মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, নইলে জনগণ রাস্তায় নামতে ভুলবে না। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হবে। আমাদের গণতন্ত্র দান হিসেবে দেওয়া হয়নি, আমরা তা অর্জন করেছি। আর দিল্লির রাস্তায় যা দেখা গেছে, তা আমাদের গণতন্ত্রের শক্তি।"
হেমন্ত আত্রি বলেন, "সরকার মনে করে তারা হিন্দু-মুসলিম নামে রাজনীতি চালাতে পারবে। কিন্তু তা হবে না। জনগণ প্রধান বিষয়গুলোর দিকে ফিরে আসছে, এবং যুবকদের এভাবে এগিয়ে আসা সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকারকে নিজের কাজে মনোযোগী হতে হবে।"








