আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'ডোনাল্ড ট্রাম্প' নামে ভাইরাল মহিষটি কি আসলেই বিরল প্রজাতির?
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
"ভালোই লাগলো, চিড়িয়াখানায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখলাম, চুল এবং গায়ের রঙের সাথে মিল আছে। উৎসুক জনতা যেভাবে মহিষটাকে দেখছে সেটা দেখে আরো বেশি মজা পাইছি।"
বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় আসা দর্শনার্থী আসাদুজ্জামান কানন।
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা কিংবা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদের সুবাদে মানুষের আগ্রহের কারণে মহিষটি এখন বলতে গেলে রীতিমতো 'সেলিব্রিটি'। ঈদের ছুটিতে ঢাকার চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এই অ্যালবিনো মহিষটি।
এ বছর ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর বাজারে ব্যাপকভাবে আলোচিত মহিষটিকে ঈদের আগের দিনই নেওয়া হয় সরকারি হেফাজতে। মহিষটিকে কোরবানি না করে সংরক্ষণ করার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরবর্তীতে চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয় এটিকে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এক বিবৃতিতে বলেন, অ্যালবিনো মহিষটি বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা হওয়ায় সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, অ্যালবিনো মহিষ কি আসলেই বিরল? চিড়িয়াখানায় মহিষটি রাখার বিষয়ে কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
প্রাণিসম্পদ গবেষকরা বলছেন, অ্যালবিনো আসলে মহিষের কোনো জাত নয়, এটি প্রাণীর একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য মাত্র।
এক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তনের ফলে প্রাণীর দেহে মেলানিনের অভাবে এমনটি হয়। এই অবস্থাকে অ্যালবিনিজম বলা হয়, যা যে-কোনো জাতের মহিষে বিরলভাবে দেখা যায়, বলছেন গবেষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের, অ্যানিম্যাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের প্রধান ড. মো. মুনির হোসেন বলছেন, "অ্যাবিনিজম সত্যিকার অর্থে এক ধরনের জেনেটিক ডিজঅর্ডার বা ক্যারেক্টার, এটা বিরল।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুুুুন:
চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়েছে কেন?
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা, যেটি ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত- শুক্রবার সরেজমিন সেখানে গিয়ে দেখা গেলো হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। ঈদের পরদিন পরিবার, বন্ধু, স্বজনদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছেন অনেকেই।
চিড়িয়াখানার প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের সময়ই গেটে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কাছে "ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন পাশে?"- এমন প্রশ্ন করতে শোনা গেলো অনেক দর্শনার্থীকেই।
মহিষটিকে কোথায় রাখা হয়েছে- চিড়িয়াখানায় এটি একটি সাধারণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
বেশ খানিকটা এগিয়ে চিড়িয়াখানার যে অংশে মহিষটিকে রাখা হয়েছে সেখানে যেতেই দেখা গেলো উপচে পড়া মানুষের ভিড়।
অন্য পশু-পাখি দেখতে যতটা আগ্রহ, তার থেকে অ্যালবিনো মহিষটিকে নিয়েই যেন বাড়তি কৌতূহল। কেউ মহিষটিকে চিৎকার করে নাম ধরে ডাকছেন, কেউ আবার ছবিও তুলছেন। গণমাধ্যমকর্মীদেরও বাড়তি উপস্থিতি সেখানেই।
পরিবার নিয়ে গাজীপুর থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসেছেন আব্দুল মজিদ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এসে অনেক প্রাণীই দেখলাম, অনেকেই বলছিল মহিষটা ওনার মতই ফেসকাটিং, তাই আমিও আসছি দেখতে, ভালোই মিল আছে।"
"বিশেষ আকর্ষণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ে ফেসবুকে অনেক আলোচনা দেখছি, সেই আকর্ষণ থেকেই আসলে কী দেখি, সেইম ওইরকমই তো লাগে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই চেহারা," বিবিসি বাংলাকে বলেন মাহমুদ হাসান নামের আরেক দর্শনার্থী।
যদিও মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অ্যালবিনো মহিষটি চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের মতো কোনো প্রাণী কি না এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মহিষটিকে প্রদর্শনীর জন্য নয়, বরং গবেষণার জন্যই চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
"এই মহিষের যে ক্যারেক্টারগুলো, তা আমরা স্টাডি করে দেখতে চাই। এছাড়া এই মহিষের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে কি না, যেটি কাজে লাগিয়ে মহিষের জাত উন্নয়নে কোনো গবেষণা করা যায় কি না সেটি দেখাও আমাদের একটি উদ্দেশ্য," তিনি বলেন।
অতীতে কখনও চিড়িয়াখানায় মহিষ রাখা হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, "গত ছাব্বিশ বছরের রেকর্ড আমি ঘেঁটে দেখেছি, দুই হাজার সাল থেকে অদ্যাবধি চিড়িয়াখানায় কখনও মহিষ ছিল না।"
মহিষটি কি আসলেই বিরল?
বাংলাদেশে ঈদুল আজহার আগে থেকেই আলোচনায় ছিল- 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' নামে ভাইরাল মহিষটি বিরল প্রজাতির কি না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে অ্যালবিনো মহিষ খুব বেশি দেখা যায় না। কেবল ব্যক্তিগত কিছু খামারেই অ্যালবিনো মহিষ লালন-পালন করা হয়।
বাংলাদেশ মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলছেন, সাদা বা গোলাপি রঙের এই ধরনের মহিষ মূলত দেশের বাইরে থেকেই ব্যক্তি উদ্যোগের খামারিরা এনে থাকেন।
"এটা খুব বেশি দেখা যায় না, আমাদের এখানেও নাই- ব্যক্তি উদ্যোগের কিছু খামারে আপনি এই ধরনের মহিষ দেখতে পাবেন," বলেন তিনি।
সম্প্রতি আলোচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষটি নারায়ণগঞ্জের যে খামার থেকে কেনা হয়েছিল, সেখানে একই ধরনের মোট ছয়টি মহিষ ছিল।
রাবেয়া অ্যাগ্রোর কর্মচারী মাসুদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' নামে পরিচিতি পাওয়া এই মহিষটিসহ ছয়টি অ্যালবিনো মহিষ ছিল তাদের কাছে। ঈদের আগে সবকটিই বিক্রি হয়ে গেছে।
তিনি জানান, তারা রাজশাহীর সিটি হাট থেকে এই মহিষগুলো কিনেছিলেন, এগুলোর অরিজিন সম্পর্কে, অর্থাৎ কোথায় জন্ম বা কোন জায়গা থেকে এসেছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণা নেই।
এর বাইরে, ব্যক্তি মালিকানাধীন আরও খামারে এরকম মহিষ রয়েছে বলেও বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে।
তবে প্রকৃতপক্ষে অ্যালবিনো বলতে মহিষের কোনো জাত নেই বলেই জানাচ্ছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, অ্যালবিনিজম মূলত এক ধরনের জেনেটিক ডিজঅর্ডার বা বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের, অ্যানিম্যাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস্ বিভাগের প্রধান ড. মো. মুনির হোসেন বলছেন, মহিষ সাধারণত কালো বা কিছুটা ধূসর বর্ণের হয়ে থাকে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাদা বা হালকা গোলাপি রঙের মহিষও দেখা যায়।
এক্ষেত্রে জেনেটিক মিউটেশন এর কথা বলছেন এই গবেষক। যেখানে একটি প্রাণীর শারীরিক গঠন এবং বর্ণসহ নানা ধরনের বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন হতে পারে।
তার ভাষ্য মতে, এটি এক ধরনের জেনেটিক ডিজঅর্ডার যেখানে লিউসিসটিক, অ্যালবাইনো, ডাইলুটেড ফেনোটাইপসহ বেশ কয়েকটি ধরনের হতে পারে। এই তিন ক্ষেত্রেই কোনো পশু বা পাখির ত্বক, চুল বা পশমের রং ফ্যাকাশে বা ঘোলাটে হয়।
মি. হোসেন বলছেন, "টাইরোসিনেস নামক এক ধরনের এনজাইম, যেটা শরীরে মেলানিন তৈরি করে, এর মিউটেশনটা যদি ফাদার-মাদার দুজনই ক্যারি করে এবং যদি রিসেসিভ কন্ডিশনে আসে তাহলে এই ধরনের ক্যারেকটারিসটিকস আমরা দেখতে পাই। অ্যালবাইনিজমটা আসলে রেয়ার," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এই পরিবর্তনটি শুধু মহিষ নয়, নানা ধরনের প্রাণী মধ্যেই হতে পারে বলে জানান এই গবেষক।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "মাত্র মহিষের ক্ষেত্রে নায়, সাপ, ইঁদুর, কিছু কিছু সরীসৃপ প্রাণী, এমনকি পাখির মধ্যেও অনেক সময় অ্যালবিনিজমের ক্যারেক্টার দেখা যায়।"
মহিষের মধ্যে এই ধরনের পরিবর্তন বাংলাদেশে কতটা দেখা যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে মি. হোসেন বলছেন, বেশ কিছু ধরনের অ্যালবাইনিজম দেখা গেলেও সাদা বা গোলাপি বর্ণের অ্যালবাইনিজম বেশ বিরল।
"পার্শিয়াল অ্যালবাইনিজম, টেম্পারেচার সেনসিটিভ অ্যালবাইনিজম আমরা দেখেছি বা কিছুটা ভ্যারিয়েন্ট যেটা- অকুলোকিউটেনিয়াস অ্যালবাইনিজম সেটাও হয়ত টুকটাক দেখা যায়, তবে এই গোলাপি বর্ণের যে অ্যাবাইনিজটা সেটা রেয়ার," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বিএলআরআই এর গবেষকরা বলছেন, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই ধরনের মহিষ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে অ্যালবিনো মহিষ খুবই বিরল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএলআরআই এর একজন গবেষক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "অ্যালবিনো মহিষ মূলত আলাদা মহিষের কোনো জাত নয়। এটি জিনগত পরিবর্তনের কারণে হয়, ফলে মেলানিন তৈরি হয় না।"
ওই গবেষক জানান, সম্প্রতি মিয়ানমার বা অন্য কোথাও থেকে কিছু অ্যালবিনো মহিষ খামারিরা বাংলাদেশে এনেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বিএলআরআই এর মহিষ গবেষণা খামারেও কয়েকটি অ্যালবিনো মহিষ রয়েছে যেগুলো দেশি মহিষ থেকে হয়েছে।
মহিষের জাত উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম আরও বাড়ানোর কথা বলছেন গবেষকরা।
তারা বলছেন, পৃথিবীর অনেক দেশে দুধের জোগান মূলত মহিষ থেকেই আসে। গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাত উদ্ভাবন বা মহিষ লালন-পালন বাড়ানো যায়, তাহলে দেশের দুগ্ধশিল্পে বড়ো ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে মহিষ।
"মহিষের মিল্ক প্রডাকশন অনেক বেশি। এর দুধে ফ্যাট ও প্রোটিনের মাত্রাও বেশি থাকে," বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের, অ্যানিম্যাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস্ বিভাগের প্রধান ড. মো. মুনির হোসেন।