ঘুমের মধ্যে মানুষ গাছে উঠতে পারে?

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে রাতে নিখোঁজ থাকা একজন নারীকে গাছের মগডাল থেকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। ওই নারীর পরিবার জানিয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক রোগে আক্রান্ত।

তিনি কীভাবে ও কখন উঁচু একটি গাছের অতটা উপরে উঠলেন তা নিয়ে পরিষ্কার তথ্য না পাওয়া গেলেও, তাকে গাছের মগডালে পাওয়ার ঘটনা ওই অঞ্চলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এমনকি বাংলাদেশে কথিত 'ভূত-প্রেত' কেন্দ্রিক যেসব কুসংস্কারভিত্তিক গল্প বা কাহিনী প্রচলিত আছে সেগুলোও এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসছে।

যদিও ঘুমের ঘোরে গাছে ওঠার ঘটনা মানুষের জন্য বিরল হলেও তা মোটেও অসম্ভব নয় বলেই জানান বাংলাদেশ স্লিপ সার্জনস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু।

তার মতে, সিভিয়ার স্লিপ ডিসটার্বনেস, অর্থাৎ ঘুমের যদি খুব বেশি ব্যাঘাত ঘটে বা ঘুমের বিকৃতি ঘটে তখন মানুষ এই ধরনের বিপজ্জনক কাজ করতে পারে।

"এমন পরিস্থিতিতে মানুষ ঘুমের মধ্য থেকে উঠে গিয়ে গাছে উঠে পড়া, দেয়াল বেয়ে অন্য পাশে যাওয়া বা চা বানাতে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক কাজ করে ফেলে। কিন্তু এই যে কাজটা সে করেছে এটা তার মনে থাকে না। পরদিন সে বলতে পারবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

যদিও চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের মধ্যে গাছে ওঠার ঘটনা মানুষের ক্ষেত্রে বিরল, অর্থাৎ কালেভদ্রেই ঘটে। তবে কিছু প্রাণীর মধ্যে ঘুমের মধ্যে গাছে ওঠা কিংবা গাছের ওপরে ঘুমানোর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

মনিলাল আইচ লিটু বলছেন, "অনেক জায়গায় দেখবেন ট্যুরিস্টরা গাছের ওপরে নির্মিত কাঠের ঘরে ঘুমাতে পছন্দ করে। কারণ এটি তাদের শক্তি, মানসিক স্থিরতা দেয় এবং তারা এক ধরনের সুখ অনুভব করেন। পাহাড়ি ও পশ্চিমা ট্যুরিস্টদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায় বেশি। কিছু অঞ্চলে আদিবাসীরা গাছের ওপরে বিশেষ কায়দায় ঘুমায়"।

ঘুমের মধ্যে হাঁটে কারা, স্লিপ ওয়াকিং কী

মনোবিদ ও ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা স্লিপ ওয়াকিং হলো একজন ব্যক্তি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নিজ থেকেই উঠে হাঁটা-চলা বা বিভিন্ন কাজ করা।

"এটা এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। ঘুম যখন খুব গভীর হয় তখন কিছু মানুষ উঠে টয়লেটে যায়, চা খায়, কিংবা হাঁটাহাঁটি করে," বলছিলেন মনিলাল আইচ।

তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া- এর সাবেক মহাসচিব।

তিনি জানান, ঘুমের একটি পর্যায় হলো র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ, যখন মানুষ স্বপ্ন দেখে এবং এই পর্যায়ে মানুষের মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় থাকে।

আরেকটি হলো নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ। এটির আর তিন ধাপ আছে- হালকা, মধ্যম ও গভীর। অর্থাৎ ঘুম গভীর পর্যন্ত হওয়ার বিভিন্ন পর্যায়।

সাধারণত গভীর ঘুমের পর্যায়ে এমন ঘটনা ঘটে যে একজন উঠে হাঁটাহাঁটি বা অন্য কোনো কাজ করছে।

"সাধারণত ঘুমের ঘাটতি তীব্র হলে, শ্বাসকষ্ট বা অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম, পিটিএসডি বা নাইট টেরর, অ্যালকোহল বা ঔষধের প্রভাবে কিংবা ঘুমের যথাযথ পরিবেশ না থাকার কারণেও এসব হতে পারে," বলছিলেন মনিলাল আইচ লিটু।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র ও এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়োক্লিনিকের তথ্য বলছে, যারা ঘুমের মধ্যে হাঁটেন তাদের কেউ কেউ এই অবস্থাতেই পোশাক পরা, কথা বলা বা খাওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজকর্ম করেন।

কেউ কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, গাড়ি চালান, অজান্তেই যৌনকর্মে লিপ্ত হন। আবার সিঁড়ি থেকে পড়ে বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার মতো ঘটনায় আহতও হন।

ঘুম থেকে ওঠার পর অল্প সময়ের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে হিংস্র হয়ে ওঠেন। আর তারা যা করেছেন অনেক সময়ই জেগে ওঠার পর তা আর মনে থাকে না।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সঠিক মাত্রায় ঘুম না হলে একজন মানুষ ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন যার কারণে একটি সুন্দর জীবনও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

তবে ঘুম নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি, তাই দেশের কী পরিমাণ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন এবং এর পেছনে প্রধান কারণগুলো কী সে সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

ঘুম কম হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কম ঘুমের সাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং মোটা হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, "সঠিক মাত্রায় নিয়মিত ঘুম হলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। আবার নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত বা অনিদ্রা হলে তা একজন মানুষকে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ফেলে দিতে পারে"।

আবার ব্যক্তি যখন ঘুমান তখন অনেকে আছে ঘুমের ঘোরেই বিছানা থেকে উঠে হাঁটেন, কথা বলেন এমনকি একা একা কাঁদতেও পারেন।

অনেকে আবার স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হন। স্লিপ অ্যাপনিয়া হচ্ছে ঘুমানোর সময় শ্বাসনালী কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া।

শ্বাসনালী বন্ধ থাকার সময়ে রোগী নিঃশ্বাস নিতে পারেন না। এতে বাইরে থেকে বাতাসের মাধ্যমে অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।

এতে মস্তিষ্ক, হার্ট বা অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিনের পর দিন কিছু সময়ের জন্য অক্সিজেনের ঘাটতির ফলে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

যার প্রভাবে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত রোগী বার বার জেগে ওঠেন। বার বার ঘুম ভাঙার কারণে তারা ক্লান্ত থাকেন, ফলে দিনের বেলায় ঝিমুতে থাকেন।

অনেক সময়, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়, বিশেষ করে চিত হয়ে ঘুমানোর সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ঘুমের মধ্যে ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে ওঠেন বা বসে পড়েন, কিছু সময়ের জন্য হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের স্লিপ অ্যাপনিয়া ধরা পড়লে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তবে দীর্ঘদিন যদি এই সমস্যার সুরাহা করা না হয় তাহলে পরিস্থিতি জটিল আকার নেবে এবং শরীরের জরুরি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হওয়া শুরু হবে।

চিকিৎসক ও গবেষকরা যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন- যেমন, সপ্তাহে এক থেকে দুই বারের বেশি অথবা এক রাতে বেশ কয়েকবার ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঘটনা ঘটলে; যিনি ঘুমের মধ্যে হাঁটেন তার জন্য বা অন্যদের জন্য বিপজ্জনক আচরণ করা হলে।

কোনো শিশুর এ ধরনের সমস্যা কৈশোর পর্যন্ত চলতে থাকলে অথবা প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে প্রথমবারের মতো এই সমস্যা শুরু হলেও ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।