এসএসসির খাতা কি দ্বিতীয়বার মূল্যায়নের আবেদন করা যায়?

    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ করার পর তা পুনরায় নিরীক্ষা হয়ে ফেল থেকে পাস করেছেন চার হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী; আর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিন হাজার ৭৯ জন।

এছাড়া, বিভিন্ন বিষয়ে অনেক শিক্ষার্থীর ফলও পরিবর্তন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড পুনর্মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করে।

এর আগে গত ১০ই অগাস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার মূল ফল প্রকাশ করা হয়েছিল।

এরপর ১৭ই অগাস্ট পর্যন্ত ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়।

এবার পুনঃনিরীক্ষা বা পুনরায় মূল্যায়নের জন্য রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছিলো।

কিন্তু কেউ যদি এই ফলাফলেও সন্তুষ্ট না হন, তাহলে কি তিনি ফের আবেদন করতে পারবেন?

ফের মূল্যায়ন নিয়ে যা বলছে বোর্ড

পুনঃনিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফলেও কোনো শিক্ষার্থী সন্তুষ্ট না হলে একই উত্তরপত্র দ্বিতীয়বার নিরীক্ষণের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা।

ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ বিবিসি বাংলাকে জানান, মোট চারটি ধাপ পেরিয়ে এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী এরপর আর পুনঃনিরীক্ষার করার সুযোগ নেই।

"বোর্ডের একটা নীতিমালা আছে, আমি সেই নীতিমালার বাইরে যেতে পারবো না। এখন এরপরও যদি কেউ সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে তাকে আদালতেই যেতে হবে," বলেন তিনি।

একই কথা জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশালের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা।

তিনি বলেন, "এখন একটাই সুযোগ আছে, কোর্ট। কোর্টে গিয়ে যদি কেউ রিট করে যে আমার খাতাটায় আমি সন্তুষ্ট না, আমি আবার এটা দেখতে চাই, আর কোর্ট যদি আমাদের আদেশ দেয়, আমরা তখন সেটাই করতে বাধ্য।"

কেন দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষার সুযোগ নেই, সেটি ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক রেজা বলেন, একটি উত্তরপত্র এরই মধ্যে চারটি ধাপ পেরিয়ে আসে।

প্রথমে পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। এরপর প্রধান পরীক্ষক সেটি দেখেন। পরে নিরীক্ষক নম্বরের হিসাব ঠিক আছে কি না যাচাই করেন। আর পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হলে আরেকজন পরীক্ষক দিয়ে উত্তরপত্রটি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।

"চারটা ধাপ হয়ে গেছে। এর পরে আমাদের কিছু করার নাই," বলেন অধ্যাপক রেজা।

খাতা মূল্যায়নে রেকর্ড আবেদন

এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।

অথচ, পূনর্মূল্যায়নের আবেদন করেছিলো মোট চার লাখ দুই হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী। ৩০ হাজারের বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিলেন এই তালিকায়।

একজন পরীক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারেন। ফলে পরীক্ষার্থীর তুলনায় পুনঃনিরীক্ষণের জন্য জমা পড়া উত্তরপত্রের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে, এবার লিখিত পরীক্ষার ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার দুই লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়।

অর্থাৎ, মোট আবেদনের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি।

এসএসসির খাতা পুনরায় মূল্যায়নে আবেদনের সংখ্যা নিয়ে এর আগে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

তিনি বলেছিলেন, "দেখে মনে হচ্ছে যেন সকলেই খাতা মূল্যায়ন করতে চায়। মানে আমাকে আবার ২০ লক্ষ শিক্ষার্থীর খাতা প্রত্যেকটিই দেখতে হবে। ইট ইজ কোয়াইট ইমপসিবল।"

ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কথাও জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।

মূল্যায়নে গলদ কোথায়?

এ বছর এসএসসির উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষায় বেশি আবেদন জমা পড়ার পর এ নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিলেন গত অগাস্টে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা মূলত আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা এবং দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০ এর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা অনুযায়ী উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষার সুযোগ থাকালেও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই।

সম্প্রতি গণমাধ্যমকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন যে, এবারের অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।

তিনি বলেন, "যে ১২ লাখের বেশি আবেদন হয়েছে, সেটি রিচেক করে তারপর কলেজে অ্যাডমিশন দিতে হবে। এটা একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।"

ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নের আবেদন করতে হলে কোন বিয়ষগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে সেটি নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে।

"কোন ধরনের খাতাগুলো রিএক্সামিন হতে পারে। আমরা ওই খাতাগুলোকেই অ্যাড্রেস করবো যেগুলোতে সিভিয়ারলি প্রবলেম," বলেন তিনি।

এছাড়া, যে-সব শিক্ষক খাতা দেখছেন, তাদের জবাবদিহির বিষয়টিও নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

"তারা কি আদৌ কোয়ালিফাইড, তারা ঠিকমতো খাতা দেখছেন কি না, আন্ডার মার্কিং করছে কি না-ওভার মার্কিং করছে কি না- তাদেরকে অ্যাড্রেস করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে, ইট ইজ হিউজ টাস্ক," বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে-কোনো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র যদি কেউ অতিরিক্ত (ওভার মার্কিং) বা কম মূল্যায়ন (আন্ডার মার্কিং) করে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, কিংবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

তবে এক্ষেত্রে, তৃতীয় কোনো পরীক্ষক যদি অতিরিক্ত বা কম মূল্যায়নের বিষয়টি নির্ধারণ না করেন, তাহলে এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা যাবে না।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অবশ্য বলছেন, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নীতিমালা এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও স্থায়ী ব্যবস্থা নয়।

এছা্‌ড়া, দেশের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও তখন প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালাম।

তিনি বলেছেন, তাত্ত্বিক পরীক্ষা নির্ভর যে মূল্যায়ন পদ্ধতি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে, তাতে একজন শিক্ষার্থীর যথার্থ মূল্যায়ন কখনই সম্ভব নয়।