শিশু ধর্ষণ ও হত্যা প্রতিরোধে আইনে কী পদক্ষেপ রয়েছে?

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু রামিসার ঘটনাটি যেমন নাড়া দিয়েছে পুরো বাংলাদেশকে, তেমনি গত একমাসে আরো অন্তত তিনটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে।

এই শিশুদের প্রত্যেকেরই বয়স চার থেকে দশ বছরের মধ্যে।

গত ছয়ই মে থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুরা এমন নৃশংসতার শিকার হয়েছে।

গত ১৪ ই মে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় নিখোঁজের একদিন পর লামিয়া আক্তার নামে চার বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেফতার নবম শ্রেনির শিক্ষার্থী মুরশালিন জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ওই ঘটনার দুইদিন পরে ১৬ ই মে গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকটি খবরে বলা হয়েছে, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে।

গত ১৯শে মে, পাবনার চাটমোহরে টাকার প্রলোভন ও ঘর ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে বলেও গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে নেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ছয়ই মে সিলেটের জালালাবাদ এলাকার একটি ঘটনার কথা জানিয়েছে।

এই ঘটনায়ও চার বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

বেশিদিন আগের কথা নয়, মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় একটি শিশুর রক্তাক্ত ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল।

ওই শিশুটিও ধর্ষণচেষ্টার শিকার ও পরে শ্বাসনালী কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয় তাকে।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় দশ বছরের নিচে বয়স ওই শিশুটিও মারা যায়।

ঠিক এক বছর আগের মাগুরার আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার কথা কী ভুলে গেলেন?

গত বছরের শুরুতে মার্চ মাসে এই শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল পুরো বাংলাদেশ।

এইচআরএসএস মানবাধিকার সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনা ঠেকাতে বা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইনী ব্যবস্থা রয়েছে কী?

কিভাবেই বা এমন অপরাধ ঠেকানো যায়?

মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফওজিয়া করিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যৌন হয়রানি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি নীতিমালা আছে, কিন্তু সেটি আইনে পরিণত হয়নি।"

এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি সবচেয়ে বেশি জরুরি।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধীর প্রোফাইল তৈরির জন্য পুলিশের একটি সফটওয়্যার রয়েছে। যাতে তার সকল তথ্য থাকে।

অপরাধীর প্রথমবারের অপরাধের রেকর্ড রাখার পর আবার অপরাধ করলে পূর্ব রেকর্ড খুঁজতে গেলে ওই সফটওয়্যারে সকল তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

গত চার-পাঁচ বছর ধরে এই সিস্টেমে অপরাধীর তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।

পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, "সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে সাধারণত এ ধরনের অপরাধ হয়ে থাকে।"

"বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিংসহ নানা উপায়ে পুলিশ নিয়মিতই প্রিভেনটিভ মেজার নিয়ে থাকে। কিন্তু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অপরাধ প্রতিরোধ করা পুলিশের পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য" বলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালায় কী বলা হয়েছে?

বাংলাদেশে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোন আইন না থাকায় ২০০৮ সালে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি একটি রিট করে।

ওই রিটের শুনানি শেষে পরের বছর ১৪ই মে রায় দেয় হাইকোর্ট।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালত একটি নীতিমালা তৈরি করে দেয়।

এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি – বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ওই নীতিমালাটিই দেওয়া হয়েছে।

আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এই নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ওয়েবসাইটে বুকলেট আকারে নীতিমালাটি রয়েছে।

এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, "যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা, এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং যৌন হয়রানি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।"

যৌন হয়রানির সংজ্ঞাও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়।

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফওজিয়া করিম বলেন, "সেক্সুয়াল অফেন্স করেছেন এমন অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাকে মসজিদ, বাজার-ঘাটসহ সবকিছু থেকে প্রতিরোধ করে বয়কট করতে হবে।"

এই মানবাধিকার কর্মী জানান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

"গণমাধ্যমকে জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। প্রত্যেকটা টিভিতে এ ধরনের ক্যাম্পেইন হবে সেটা নিশ্চিত করতে হবে" বলেন মিজ করিম।

তবে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও এ ধরনের অপরাধ কেন কমছে না এমন প্রশ্নে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, "উন্নত দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ।"

"একজনকে মেরে ফেললেই তো শেষ, কিন্তু মানুষকেতো জানতে হবে। তাই অপরাধীকে শাস্তি দেয়া এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা বেশি জরুরি" বলেন মিজ করিম।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা বলছে

সাধারণত কোন অপরাধ কার্যক্রম সংঘটিত হলে এবং থানায় সেটি নিয়ে রিপোর্ট করা হলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই ঘটনার তদন্ত করে থাকে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সাধারণত কোনো ঘটনা পুলিশে রিপোর্ট হলে সেই অনুযায়ী তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা নেই।"

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম নামে একটি সফটওয়্যারে অপরাধীদের তথ্য সংরক্ষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে, এই সময়ের আগের অপরাধীদের তথ্য এই সফটওয়্যারে পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

মি. নাসিরুদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম নামে একটি সফটওয়্যার আমাদের আছে। একটি মামলা হলে ওই সফটওয়্যারে আসামির নাম এন্ট্রি হয়ে যায়।"

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "ওই ঘটনার পরে অন্য কোথাও সে যদি ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিজ করে অ্যারেস্ট হলে তার নাম ও পিতার নাম দিয়ে সার্চ দিলে অন্য কোথাও মামলা আছে কি না সেটাও বের হয়ে যায়।"

"ব্যক্তিগত বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সতো প্রতিরোধ করার কোন উপায় নেই" বলে উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলছেন, "ধরুন কোনো এলাকায় ছিনতাই হচ্ছে জানার পর আমরা আমাদের ভিজিবিলিটি বাড়িয়ে পদক্ষেপ নিতে পারি। কিন্তু ঘরে মানে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সতো পুলিশ দিয়ে ঠেকানো মুশকিল। কারণ এটা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেও হয়।"

আইন প্রয়োগ অথবা পুলিশ দিয়ে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা মুশকিল বলেও উল্লেখ করেন মি. নাসিরুদ্দিন।

একজন নাগরিক হিসেবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "পারিবারিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে এই ধরনের অপরাধ ঠেকানো যায়।"

শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড

পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে এই সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

সাংবাদিকদের হোয়াটসএপের এক গ্রুপে আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এই তথ্য জানিয়েছেন।

আইনমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান বলেছেন, "দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।"

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সরকার গঠনের পর থেকে এ ধরনের প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। আসামি এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।"

এদিকে, এই ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বুধবার কারাগারে পাঠিয়েছে ঢাকার একটি বিচারিক আদালত।

এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান।

অভিযুক্ত সোহেল তার জবানবন্দিতে কীভাবে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন সেটি বর্ণনা দিয়ে 'দোষ স্বীকার' করেছেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এদিকে, ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের পক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে।

এই জোটের পক্ষে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের সহিংসতা থেকে নাগরিকদের বিশেষত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ-ও বলা হয়েছে, এ ধরনের সহিংসতা দেশের বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ বিষয়ক জাতিসংঘের সনদের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।