ইরানের সঙ্গে চুক্তির আগে ইসরায়েল সংক্রান্ত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে কেন সামনে আনছেন ট্রাম্প?

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাব্য শর্ত হিসেবে "সব দেশকে অবিলম্বে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করার" আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে করা একগুচ্ছ চুক্তি, যা ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত হয়।

সম্প্রতি নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, "আমি বাধ্যতামূলকভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি যেন সব দেশ অবিলম্বে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করে, এবং যদি ইরান আমার সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তবে তাদেরও এই অভূতপূর্ব বিশ্ব জোটের অংশ হওয়া সম্মানের বিষয় হবে"।

এই পোস্টটি আসে ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, জর্ডান, বাহরাইন ও মিশরের নেতাদের এক ফোনালাপের পর। এদের মধ্যে কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

বুধবার তিনি আবারও একই আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে। বৈঠকের মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানান তিনি।

তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে পাকিস্তান, যারা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, পাকিস্তান এমন কোনো চুক্তিতে যোগ দেবে না যা তার দেশের "মৌলিক আদর্শের" সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি এটাও বলেন, ইসরায়েলের কথায় "বিশ্বাস করা যায় না"।

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধান প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে একদিকে মুসলিম-প্রধান দেশগুলো এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রধান মতভেদের বিষয় হয়ে আছে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস নেতৃত্বাধীন হামলায় প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নেওয়ার ঘটনায় গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস কী?

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতা করে; দেশগুলো হলো- বাহরাইন, মরক্কো, সুদান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই।

ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল ইসরায়েল।

প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এই পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের পর্যটন, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।

পরে ২০২০ ও ২০২১ সালে আলাদা চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ও সুদান এতে যোগ দেয় এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে কাজাখস্তান এতে যুক্ত হয়।

২০২০ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে "শতাব্দীর সুযোগ" বলে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এটিকে "শতাব্দীর চপেটাঘাত" বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি ওই সময় পশ্চিম তীর থেকে টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, "আমি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে বলছি- জেরুজালেম বিক্রির জন্য নয়, আমাদের সব অধিকার বিক্রির জন্য নয় এবং দর-কষাকষির জন্য নয়। আপনাদের এই চুক্তি, এই ষড়যন্ত্র, কার্যকর হবে না"।

এই চুক্তির নিন্দা জানিয়েছিল ইরানের নেতৃত্বও।

মূল মতবিরোধগুলো কী?

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি আরব দেশগুলো ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রধান মতবিরোধের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

এই চুক্তি দীর্ঘদিনের সেই আরব ঐকমত্য থেকে সরে আসে, যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের শর্ত ছিল ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা।

ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বলেন, চুক্তির শর্ত হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন ইসরায়েল পশ্চিম তীরের বৃহৎ অংশ দখল-সংযুক্তির পরিকল্পনা স্থগিত করুক।

পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতিতে প্রায় সাত লাখ ইসরায়েলি ইহুদি বাস করে।

আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ বলে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে।

চুক্তির কী প্রভাব পড়েছে?

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ২০২০ সালে ধারণা করেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাণিজ্য বছরে প্রায় চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং এতে ১৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (সিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইসরায়েল ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য চার বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে এই চুক্তি দেশটির সামরিক ও বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষা আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

আমিরাত ও বাহরাইন উভয়ই ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে বাণিজ্য করতে পারছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম উন্নত উচ্চপ্রযুক্তি খাত রয়েছে।

মরক্কো স্পষ্ট কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ ও কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। অন্যদিকে সুদানের অংশগ্রহণ মূলত স্থবির রয়েছে এবং কাজাখস্তানের যোগদান ছিল প্রধানত প্রতীকী।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং ইসরায়েলসহ ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।