আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ব্লেজার, টাই, কামিজসহ সাবেক ভূমিমন্ত্রীর জব্দ করা জিনিসপত্র এখন কী করা হবে
আশির দশকের মাঝামাঝি আন্দোলনের মুখে ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস নির্বাসনে যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোস।
বিশেষ করে তার প্রাসাদে পাওয়া প্রায় তিন হাজার জোড়া জুতো বৈশ্বিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। পরে ২০০১ সালে তার প্রায় সাতশ জোড়া জুতো প্রদর্শনের জন্য মারিকিনা সু মিউজিয়ামে রাখা হয়।
বাংলাদেশেও নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরশাসনের পতনের পর তখনকার ফার্স্টলেডি রওশন এরশাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছিল।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলে আগের সরকারের এমপি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা অনেকটাই নিয়মিত ঘটনা।
সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই সরকারের বহু মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক।
এর অংশ হিসেবেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়। এজন্য শুরুতেই দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের সমন্বয়ে ৭ সদস্যের একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার দুটি ফ্ল্যাট ক্রোক বা জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছিল ঢাকার একটি আদালত। রোববার সেই দুই ফ্ল্যাটেই অভিযান চালিয়ে দুদক ব্লেজার, টাই ও কামিজসেটসহ বিভিন্ন দ্রব্য উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল।
ফলে জামাকাপড় বা এ ধরনের উদ্ধারকৃত দ্রব্যাদি এখন কী করা হবে- তা নিয়ে জনমনে এক ধরনের কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
যা যা উদ্ধার হলো, এখন কী হবে
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের আসামী করা হয়েছে। এরপর আদালতের আদেশ পাওয়ার পর মি. চৌধুরীর গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটের নিয়ন্ত্রণ নেয় দুদক।
আদালত দুদকের একজন পরিচালককে এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
পাশাপাশি গত ২৯শে এপ্রিল এসব ফ্ল্যাটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রবেশ ও মালামালের তালিকা তৈরির আরেকটি অনুমতি দেয় আদালত।
এর ভিত্তিতে রোববার অভিযানের পর দুদক জানায় তারা মি. চৌধুরীর ফ্ল্যাটে রোলেক্সসহ আটটি বিলাসবহুল ঘড়ির খালি প্যাকেট, ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডও ছাড়াও পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি পেয়েছে।
এছাড়া তিনশর বেশি ব্লেজার বা কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ১০০ এর বেশি কামিজ ও ৩ সেট মুক্তার গয়না পেয়েছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটগুলো থেকে ঝাড়বাতি, খাট ও সোফা জব্দ করেছে দুদক।
বাংলাদেশে এর আগে ফ্ল্যাট, ঘরবাড়ি, রিসোর্টের মতো স্থাপনা সরকারের অনুকূলে জব্দ করে রিসিভার নিয়োগ করার ঘটনা ঘটলেও জামাকাপড় বা এ ধরনের সহজেই স্থানান্তরযোগ্য অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে এখন কী করা হবে তা নিয়ে অনেকর মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা কয়েকটি মামলায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন দেলোয়ার জাহান রুমি।
তিনি বলছেন, রিমুভেবল সম্পদ যা যাওয়া গেছে সেগুলো এখন ফ্ল্যাটের ভেতরেই থাকবে এবং এর সবকিছুই তদন্তকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে দুদকের তত্ত্বাবধানে থাকবে।
"এরপর দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হবে। নির্দেশনা পেলে দুদক সে অনুযায়ী এসব মালামালের বিষয়ে পদক্ষেপ নিবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
দুদকের মুখপাত্র আকতারুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, দুদকের অভিযানের সময় তালিকাভুক্ত মালামাল নিয়ে কী করা হবে- সে বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক হবে দুর্নীতি দমন কমিশনের সভায়।
"কমিশন আদালতের নির্দেশনাও চাইতে পারে। আইন অনুযায়ী আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে," বলছিলেন তিনি।
আইনজীবী দেলোয়ার জাহান রুমি এও জানিয়েছেন যে, এর আগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমেদ ও তার পরিবারের মালিকানাধীন ফ্ল্যাটে থাকা এ ধরনের মালামাল প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
ওই নির্দেশের পর ১২২টি শার্ট, ২৬৬টি প্যান্ট, ৩০টি ব্লেজার, ৮টি স্যুট, ৭২২টি টি-শার্ট, ২২৪টি পাঞ্জাবি, ৪৭টি পায়জামা, ৮৮ জোড়া স্যান্ডেল, ৩৫ জোড়া কেডস, ৩৮ জোড়া জুতা, ৪৯৪টি শাড়ি, ২৫০ সেট থ্রি-পিস, ৪৯৬টি সালোয়ার-কামিজ ও ২১২টি জামা ছাড়াও বিভিন্ন পরিমাণে জ্যাকেট, বেডশিট, লেডিস ভ্যানিটি ব্যাগ, লেডিস টপস, পুরুষদের সোয়েটার, লেডিস সোয়েটার, লেডিস প্যান্ট, লেডিস টি-শার্ট, ওড়না, শাল চাদর, শীতের জামা, লেহেঙ্গা, সানগ্লাস ও ট্রাউজার ত্রাণ তহবিলে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
"এখন সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ফ্ল্যাট থেকে পাওয়া দ্রব্যগুলোর বিষয়েও আদালতের নির্দেশনা চাইতে পারবে দুদক। সেক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ মতোই দুদক পরবর্তী পদক্ষেপ নিবে," বলছিলেন দুদকের আইনজীবীদের একজন দেলোয়ার জাহান রুমি।
এর আগে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের ক্রোকাদেশের পর বেনজির আহমদের আহমেদের মালিকানাধীন সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসন।
দুদকের আইনজীবীদের মতে, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলাকালে দুদকের অনুসন্ধানকারী দল যদি মনে করে যে, সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত না করলে বেহাত হয়ে যেতে পারে, তাহলে আদালতের কাছে জব্দ করার নির্দেশ চেয়ে আবেদন করার সুযোগ আছে।
তবে তদন্ত বা মামলার যেকোনো পর্যায়ে আদালত কোন ব্যক্তির সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ দিতে পারেন। বেনজির আহমেদের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের আগে তদন্ত চলাকালেই আদালতের কাছ থেকে সম্পত্তি জব্দের আদেশ এসেছিল।
এছাড়া দুদকের আবেদনের পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের (বরখাস্ত) একটি বাগানবাড়িসহ চারটি বাড়ি এবং তিনটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছিল আদালত।
আদালত তার বাড়িসহ কয়েকটি সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এছাড়া সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদেরও তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, সোমবার মি. আহসানের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে থাকা বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছেন সংস্থাটির তদন্তকারীরা। সেখানে বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র ছাড়া জামাকাপড় বা এ ধরনের যেসব দ্রব্য পাওয়া গেছে তার তালিকা করা হচ্ছে।
এর বাইরে দুদকের আবেদনে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, তাঁর পরিবারের সদস্যসহ আত্মীয়দের নামে থাকা জমিসহ প্লট–ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি কারাগারে আটক আছেন।
প্রসঙ্গত, বেনজির আহমেদ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই দেশ ছেড়েছিলেন। আর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ওই সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে জিয়াউল আহসান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হত্যা মামলায় আটক হয়ে এখন কারাগারে আছেন।